অবনির চোখে জল

অবনির চোখে জল

দুঃখ আর হতাশা একটা ছেলের জন্য যতটুকু সহনীয় মেয়েদের জন্য নাকি তা আরও বেশি সহনীয়।কিন্তু,এই কষ্ট অবনি কিভাবে সহ্য করবে..
.
সেদিন ছিল অবনির জীবনের একটা বিশেষ দিন যেদিন অবনি প্রথম স্কুলে গিয়েছিল।প্রথম দিনেই সে নাকি খুব ভাল একটা বন্ধু পেয়েছিল।বাসায় দৌড়ে এসে বাবাকে এসব বলতে লাগল..
-বাবা,,বাবা,,জানো!আজ প্রথমদিন স্কুলে আমার একটা বন্ধু হয়েছে।তার নাম হল ফয়সাল। সে অনেক পড়া জানে।আমাকে অনেক সাহায্য করেছে।আমার সাথে অনেক সময় খেলেছে।আমরা খুব মজা করেছি।স্কুল খুব ভালো জায়গা।(অবনি)
-ও তাই!আমিতো তোমাকে আগেই বলেছি স্কুলে গেলে তোমার অনেক ভাল লাগবে মা।(বাবা)

অবনির বসবাস তখন গ্রামে।মা তার জন্মের সময় মারা যান।বাবা ছিলেন গ্রামের একজন গন্যমান্য ব্যক্তি,প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক।গ্রামের উন্নয়নে সবসময় অগ্রনী ভূমিকা পালন করেন।বাবার অর্থায়নে অবনির মায়ের নামে গ্রামে তৈরী হয় একটি হাসপাতাল।আর তাই বাবার ইচ্ছে অবনি সেই হাসপাতালের একজন বড় ডাক্তার হবে।অপরদিকে ফয়সালের বাবা একজন ব্যবসায়ী।ছেলের খুশি-ই তাদের খুশি।
অবনি প্রতিদিন-ই স্কুলে যেত।একদিন স্কুলে না গেলে তার কিছুই ভাল লাগত না।কারন,সেই চতুর আর দুষ্টু ছেলে ফয়সাল!সে ক্লাসের সবাইকে খুব হাসিখুশি রাখত, আর অবনিকেও।ধীরে ধীরে তারা একজনের খুজে আরেকজন বাড়িতেও আসতে লাগল।এভাবেই দেখতে দেখতে যখন তাদের এইচ.এস.সি পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল তখন তারা অনেক চিন্তায় পড়ে যায়।কারন গ্রামে অথবা গ্রামের আশেপাশে কোনো বিশ্ব-বিদ্যালয় নেই।
-অবনি,এখন কি করবি?গ্রামে বা গ্রামের আশেপাশেতো কোনো বিশ্ব-বিদ্যালয় নেই।(ফয়সাল)
-আমি আর কি করব!আমাকে-তো ঢাকাতেই যেতে হবে।ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফর্ম কিনতে হবে।কারন আমার লক্ষ্য একজন ভাল ডাক্তার হওয়া।(অবনি)
-হুমম...
-তুই কি করবি?
-আমার বাবাও বলছে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ফর্ম কেনার জন্য।ডাক্তারদের নাকি অনেক টাকা,তাই।(ভাব নিয়ে)
-ধুর শয়তান,সোজাসুজি বলে দিলে কি হয়, তুই আমাকে ছাড়া থাকতে পারবি না।
-আমার সাথে থাকতে থাকতে তুই এক্সট্রা বুদ্ধিমান হয়ে গেছিস।ঠিক আছে যা,এখানে ফর্ম কিনব না।
-(অবনি চোখে কান্না চলে আসছিলো..)
-এই অবনি,,আরে আমিতো মজা করছিলাম।
-এরকম মজা আর কখনও করবি না।তুই আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারবিনা।আমার জীবনের শেষ বারো বছর ছিলো সবচেয়ে খুশির সময়,তোর জন্য।তুই আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু,বাবার মতো।
-কি,,,?
-আরে,বাবা একধরনের বন্ধু আর তুই আরেক ধরনের বন্ধু।
-ওহহ..বন্ধুত্বের প্রকারভেদও করে ফেলেছিস!
দুজনেই একসাথে হেসে উঠল।কিছুদিনের মধ্যেই দু'জনে ঢাকা চলে আসে।কাছাকাছি দু'জনে দুইটি ফ্লাট ভাড়া নেয়।অবনির সাথে তার দুইটা বান্ধবি আর ফয়সালের সাথে তাদের গ্রামের একটা বন্ধু রাশেদ থাকত।কিছুদিনের মধ্যেই তাদের ক্লাস শুরু হয়।তাদের দুজনেরই বিভাগ এক।প্রথমদিন ক্লাসে যাওয়ার আগে কলেজের গেইটের সামনে এসে অবনি থেমে যায়।
-কিরে,,ভেতরে যাবি না?(ফয়সাল)
-দাড়া!এই সেই জায়গা যেখানে আগামী কয়েকটি বছর কাটিয়ে দিতে পারলে আমার জীবনের একটা লক্ষ্য পূরন হবে।যে সকল মা আমার মতো অবনিকে জন্ম দিতে গিয়ে নিজেকে বিসর্জন দিতে যায় তাদের জীবন রক্ষার্থে আমি কাজ করতে পারব।(অবনি)
-তাহলে আমি কি করব!!
-তুই আমার সি.এস.হয়ে আমার চেম্বারের বাইরে দাড়িয়ে থাকবি।
-সি.এস. কি?
-চেম্বার সহকারি।
-তবে,রে,,!
অতঃপর অবনি দ্রুত গতিতে কলেজের ভেতর ঢুকে পরল।প্রথমদিন কলেজে তাদের অনেক বন্ধু হল।কিন্তু বন্ধুত্ব আর আড্ডা এসব বিষয়ে ফয়সাল বরাবরই অনেক আগ্রাসী।তাই নতুন জায়গা,নতুন বন্ধু পেয়ে ফয়সাল তাদের সাথে অনেক সময় কাটায়।যার ফল স্বরুপ অবনি নিজেকে অনেকদিন পর ভীষন একা অনুভব করে।তাই কলেজ শেষ করে অবনি একা একা-ই চলে যাচ্ছিলো..
-কিরে,,কোথায় যাচ্ছিস?আমাকে ডাক-লিনা!(ফয়সাল)
-তোকে ডেকে কি হবে।তুই-তো নতুন বন্ধুদের সাথে বিজি।(অবনি)
-আরে,,কলেজে চলতে গেলে বন্ধুদের দরকার আছে।তাইতো প্রথমদিনে ওদেরকে হাত করে নিচ্ছি।
-তা করেছিস, সবার সাথে বন্ধুত্ব?
-এত সহজ নাকি ভাল বন্ধু বানানো!আরও সময় লাগবে, তাহলে কয়েকটা ভাল বন্ধু পাওয়া যাবে।
-আমার মতো।
-ধুর,,তোর মতো বন্ধু কি কেউ হতে পারবে নাকি!!এখন পর্যন্ত জীবনে অনেকের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে।কিন্তু তোর মতো বন্ধু একটাও হয়নি আর হবেও না।কারন,আমি একমাত্র তোর চোখের ভাষাই বুঝতে পারি।আমি সারা জীবন তোর পাশে ছায়ার মতো থাকব।
-কেন?
-কা.কারন,আমি তোর বন্ধু!
ক্লাস আর ফ্লাট ছাড়াও তারা বিকেল বেলা একসাথে ঘুরতেও বের হতো।এমনই একদিন পড়ন্ত এক বিকেলে দু'জনে একটা পার্কে হাটছিলো।অনেকক্ষন হাটার পর অবনি ফয়সালকে বলল আইসক্রিম নিয়ে আসার জন্য।তাই অবনিকে একটা ব্রেঞ্চে বসিয়ে ফয়সাল আইসক্রিম কেনার জন্য আইসক্রিম-ওয়ালা খুজছিলো।হঠাৎ ছুটতে থাকা একটা মেয়ে এসে ফয়সালের সাথে ধাক্কা খায় এবং তাকে জড়িয়ে ধরে।এমন সময় একটা লম্বা সুদর্শন ছেলে এসে মেয়েটাকে ফয়সালের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিলো এবং..
-দুঃখিত!ও আমার বোন।ও মানসিক ভারসাম্যহীন। আপনার সাথে এমন ব্যবহার করার জন্য ওর হয়ে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।(ছেলেটি)
-না,,কোনো সমস্যা নেই।এরকম রোগীকে মাঝেমধ্যে এভাবে পার্কে নিয়ে আসলে সেটা তার মানসিক বিকাশে অনেকটা সাহায্য করবে।(ফয়সাল)
-ধন্যবাদ..
কিন্তু মেয়েটি বারবার "আমি যাবনা,আমি যাবনা,আমি বাচতে চাই"বলে বলে চিৎকার করছিল।ফয়সাল কিছু চিন্তা করার আগে ওরা একটা গাড়িতে ওঠে চলে গেল।সে এ বিষয়ে আর কিছু না ভেবে আইসক্রিম নিয়ে অবনির কাছে যায় এবং সেদিনের মতো আর বেশি ঘুরাঘুরি না করে বাসায় চলে আসে।
কিন্তু,এর এক সপ্তাহ পর ফয়সাল একটা ভয়ংকর সংবাদ পায় টিভি-তে।মেয়েটির মৃতদেহ নাকি উদ্ধার করেছে পুলিশ।বিষয়টা তাকে বিচলিত করে তুলে।এটা তার জীবনের একটা ভয়ংকর অভিজ্ঞতা।তবুও সে কাউকে কিছু বলেনি,এই বিষয় থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখে।ক্লাস,দুষ্টামি,আড্ডা আর ফ্লাট এভাবেই কেটে যায় দুই-বছরের মতো।
হঠাৎ একদিন হসপিটালে সিরিয়াস একজন মহিলা রুগী আসে স্ট্রোক করে।মহিলার ছেলে নাম করা একজন বিশিষ্ট্য শিল্পপতি।বারোটা সিকিউরিটি গাড়ি নিয়ে যখন লোকটি হসপিটালের ভেতর ঢুকলো তখন সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।মেয়েরা একটু বেশি হতবাক।কিন্তু,ফয়সালের হতবাক হওয়ার কারন অন্যকিছু।কারন সবাই মনে করেছিল কমপক্ষে ৩৫-৪০ বছরের মধ্যবয়স্ক কোনো লোক হবে।কিন্তু লোকটি ২২-২৪ বছরের ইয়াং,লম্বা,সুদর্শন একটি ছেলে।আর ফয়সালের কাছে ছেলেটিকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে।হ্যা,,এইতো দুই বছর আগে পার্কের সেই ছেলেটা।ছেলেটাকে দেখে অনেকটা ভয় পেয়ে যায় সে। এই ছেলেতো মোটেও সুবিধার নয়।এসব ভাবছিল ফয়সাল..
মহিলা রুগী বিধায় কলেজের ভাল ভাল ইন্টার্নিরত ছাত্রীদের মহিলার খেয়াল রাখা এবং ডাক্তারদের সহযোগিতার জন্য রাখা হয়।অবনিও সেখানে যেত এবং ডাক্তারদের সহযোগিতা করত।
চার-পাঁচদিন পর মহিলাটি একদিন হঠাৎ করে অক্সিজেন মাস্ক থাকা সত্ত্বেও হাপাতে থাকে।সিলিন্ডারও ফুল।ডাক্তাররাও আশেপাশে ছিলেননা।আশেপাশের ছাত্রীরা যারা ছিল তারা ভয়ে কিছু করছেনা বরং ডাক্তার আনার জন্য ছুটে গেল।তখনি অবনি এসে আইসিইউ-তে ঢুকে।অন্যরা মানা করা সত্ত্বেও কোনো কিছু না ভেবে অক্সিজেন লেভেল পাইপ খুলে নেয় এবং অক্সিজেন সিলিন্ডারের ঢাকনা সম্পূর্ন খুলে দেয়ার পরও দেখে কোনো অক্সিজেন বের হচ্ছে না।সাথে সাথে সিলিন্ডার পরিবর্তন করে মাস্ক লাগিয়ে দেয়।অক্সিজেন আসছে কিন্তু রোগী টানতে পারছে না।হার্টের কম্পন কমে গেছে।অবনি পাঞ্চ মেশিনের সাহায্যে ইলেকট্রিক শক দেয় বুকে।কিছুক্ষনের মধ্যেই সবকিছু ঠিক হয়ে যায়।ডাক্তাররাও এতক্ষনে চলে আসে এবং অবনির অনেক প্রশংসা করেন।ফয়সালও অনেক খুশি অবনির এমন সাহসী উদ্দ্যেগে।
পরদিন ক্লাসের পর ফয়সাল অবনিকে খুঁজতে ঐ মহিলার কেবিনের দিকে যায়।কিন্তু যাওয়ার পথে মহিলার ছেলের সাথে অবনিকে কথা বলতে দেখে সে ঘাবড়ে যায়।তারা হেসে হেসে একসাথে অনেকক্ষন কথা বলতে থাকে।কথা শেষ করে অবনি আসতে থাকে এবং ফয়সালকে দেখে..
-কিরে,,এখানে কি করিস?(অবনি)
-তুই ওর সাথে এতক্ষন ধরে কি কথা বলছিলি?(ফয়সাল)
-কি আবার!তার মাকে আমি বাঁচালাম, সে কি আমার সাথে কথা বলতে পারেনা!
-না,,তুই ওর সাথে কথা বলবিনা।
-কেন?
-কেন তোর জানার দরকার নেই।ফিরতে হবে চল...
আর কোনো কথা না বলে দু'জনে দু'জনের ফ্লাটে চলে গেল।কিন্তু ফয়সাল দু'দিন ধরে খুবই উদ্ধিগ্ন..
-কিরে ফয়সাল, তোকে খুব চিন্তিত মনে হচ্ছে!(রাশেদ)
-হ্যা,অবনি আমার কাছে কিছু লুকোচ্ছে মনে হয়।সে ঐ ছেলেটার সাথে অনেক কথা বলে আর আমার কাছে মিথ্যা বলে যে,প্রয়োজন ছাড়া নাকি সে কথা বলেনা।
-তাতে তোর সমস্যা কি?
-সমস্যা আছে..
-আচ্ছা ফয়সাল,আমিতো তোদেরকে ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি।তোকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি..
-কর
-আমার মনে হয়, তুই অবনিকে ভালবাসিস।
-তুই অনেক কঠিন প্রশ্ন করে ফেলেছিস।আমি জানিনা এর উত্তর কি! কিন্তু, অবনিকে খুশি দেখলে আমিও খুশি থাকি সবসময়।আগে ছোট ছিলাম তাই হয়ত বুঝতে পারিনি।কিন্তু..
-কিন্তু এটাই ভালবাসা।ভালবাসার মানুষকে খুশি রাখাতেই একটা প্রেমিক হৃদয়ের সার্থকতা।তুই অবনিকে সোজাসুজি তোর ভালবাসার কথা বলে দে।
-আমি সোজাসুজি বলতে পারবনা।যদি না করে দেয়!আমাদের বন্ধুত্ব নষ্ট করে দেয়!
-তাহলে চিঠি লিখে দে।
ফয়সাল অনেকটা চিন্তিত হয়ে পড়ে।হঠাৎ ফ্লাটের সামনে গাড়ির হর্ণের শব্দ শুনে জানালার দিকে তাকায়।দেখে অবনি একটা কালো রঙের কার থেকে নেমেছে আর গাড়িতে থাকা কারো সাথে কথা বলছে।ফয়সাল নিজের চোখকে বিশ্বাসই করতে পারছিলো না।
পরেরদিন..
-অবনি,, গতকাল রাতে তুই কার গাড়ি থেকে নামলি?
-না-তো, কেউ না।
-কেউ না মানে!আমি নিজের চোখে দেখেছি।
-তো কি হয়েছে!ওটা রিফাতের গাড়ি।আমরা একসাথে ডিনার করেছিলাম।
-রিফাত কে?
-হসপিটালের মহিলার ছেলে।
-কি!!তোকে না ওর সাথে কথা বলতে মানা করেছি।
-তুই মানা করার কে?বন্ধুত্বের যতটুকু সীমারেখা আছে তার ভেতরে থাক।
-কিন্তু,ঐ ছেলেটা সুবিধার নয়।
তারপর ফয়সাল পার্কের সেই ঘটনাটি খুলে বলে।
-তোর বলা শেষ! ক্লাসের সময় হয়ে গেছে।আমি আসছি..
-দাড়া..(অবনির হাত ধরে)
বন্ধুত্বের শক্তি দিয়ে না পারায় ভালবাসার শক্তি দিয়ে আটকানোর চেষ্টা করে ফয়সাল।
-চিঠিটা রাখ!আমি তোকে ভালবাসি অবনি।তাই আমি তোকে এই ভুল করতে দেব না।
চিঠিটাকে অবনি ছুড়ে মারে ফয়সালের দিকে।
-এখন আমি সব বুঝতে পারছি।কেন তুই রিফাতের মতো একটা প্রতিষ্ঠিত ছেলের সাথে আমাকে মেনে নিতে পারছিস না!ছিঃ..ফয়সাল।বন্ধুত্বের মূল্য তুই এভাবে দিলি!
ফয়সাল কিছু বলতে যাবে কিন্তু অবনি তৎক্ষনাত চলে গেল।তবে যেভাবেই হোক অবনিকে এই ভুল করার হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।তাই ফয়সাল অবনির বাবাকে খবর দেয়।তিনি সন্ধ্যার আগেই শহরে চলে আসেন।
সন্ধ্যায় রিফাত অবনিকে ফ্লাটের সামনে ড্রপ করে দেয়।অবনির বাবা তা দেখতে পান।অবনি ফ্লাটে এসে..
-বাবা,তুমি!!কখন আসলে।আমাকে জানিয়ে আসলে না কেন?
-জানিয়ে আসলে কি তোর এই অধঃপতন দেখতে পেতাম!
-বাবা ও খুব ভাল ছেলে।আর..
-চুপ..তোকে এখানে পাঠিয়েছি লেখাপড়া করার জন্য। কারো সঙ্গে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরার জন্য নয়।আর ফয়সাল বলেছে ঐ ছেলেটা নাকি ভাল না।
-অনেক বলেছ বাবা।আর একটি কথাও বলো না।কি নেই ওর।গাড়ি,বাড়ি,অর্থ-সম্পত্তি সবই আছে।বর্তমান সময়ের সে একজন ইয়াং আইকন।তোমার সমস্ত সম্পত্তি দিয়েও তার এক মাসের হাত খরচও হবেনা।
তারপর বাবা কষে একটা চড় মারলেন অবনিকে।কান্না জড়ানো কন্ঠে অবনি..
-বাবা,তুমি এক্ষুনি এখান থেকে চলে যাও।
-কি বললি?
-চলে যাও!
এক বুক কান্না বুকের ভেতর রেখে অবনির বাবা হাসিমুখে গ্রামে চলে আসলেন।পরদিন ফয়সাল পাগলের মতো অবনিকে খুজছে কলেজে।একপর্যায়ে অবনিকে দেখতে পেয়ে দৌড়ে যায় তার দিকে।কিন্তু অবনি ফয়সালের কাছে এসেই কষে একটা চড় মারলো তার গালে..
-কি মনে করেছিস নিজেকে।আমার বডিগার্ড নাকি নিজেকে অনেক দায়িত্বশীল মনে করিস?তুই বাবাকে এসব কথা বলে অনেক বড় ভুল করেছিস।তুই আর কোনোদিন আমার সামনে আসবি না।যাঃএখান থেকে।
নরম গলায় ফয়সাল অবনিকে কিছু বলল..
-অবনি,শুন..
-কি?
-তোর বাবা আর নেই!
-মানে!
-গতকাল রাতে তোর বাবা স্ট্রোক করে মারা গেছেন।
-মজা করবিনা একদম! গতকালই বাবা আমার সাথে ছিল।
-আর রাতে গ্রামে গিয়ে স্ট্রোক করেছেন।
-চুপ,একদম চুপ।
দেরি না করে অবনি দ্রুত গ্রামে যায়।গিয়ে দেখে পৃথিবীতে তার একমাত্র আপনজনও তাকে ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন।আকাশ বাতাস এক করে কেঁদেও অবনির কোনো লাভ হয়নি।অবনি একদম ভেঙে পড়েছে।ফয়সালও গ্রামে এসেছে কিন্তু অবনি তাকে একদম সহ্য করতে পারছেনা।তার বাবার মৃত্যুর জন্য নাকি ফয়সালই দায়ি।একমাস পর অবনি শহরে ফিরে আসে এবং ফ্লাট পরিবর্তন করে ফয়সালের থেকে দূরে সরে যায়।কোনো ভাবেই ফয়সাল অবনির সাথে যোগাযোগ করতে পারে না।ক্লাসে আসলেও কথা হয়না।একদিন অবনিকে ফলো করে তার ফ্লাট চিনে নেয় ফয়সাল।আর সবসময় অবনির প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখে।কারন ফয়সাল জানে অবনির জন্য সামনে একটা ভয়ংকর দিন অপেক্ষা করছে।

এরপর অবশেষে তাদের ফাইনাল এক্সামের সময় এসে যায়।কিন্তু পরীক্ষার দুইদিন আগে অবনি হঠাৎ করে কলেজে আসে নি।ফয়সাল অনেকটা বিচলিত হয়ে তার ফ্লাটে চলে যায়।ফ্লাটের রুমমেট মেয়ে দু'টিকে অবনির কথা জিজ্ঞেস করলে তারা বলে অবনি রাতেও ফ্লাটে আসেনি।কথাটি শুনে ফয়সালের পৃথিবী যেন ওলট-পালট হয়ে যায়।কি করবে কিছুই ভেবে পাচ্ছেনা।সবগুলো ফোন নাম্বারও বন্ধ।রাত-দিন এক করে দু'দিন অবনিকে খুজে কিন্তু একবুক হতাশা নিয়ে ফ্লাটে ফিরে আসে সে।থানায় ডায়রিও করে।অপরদিকে অবনির এতদিনের স্বপ্ন পূরনের সময় এসে গেছে।পরীক্ষা না দিলে অবনির এত দিনের স্বপ্ন ভেঙে যাবে।আর ফয়সাল বুঝতে পারে অবনিকে রিফাত কোথাও আটকে রেখেছে।তাই ফয়সাল পরদিন কলেজের সকল বন্ধুদের সাথে কথা বলে পরীক্ষার তারিখ পিছিয়ে নেয়ার জন্য।সবার সাথে ফয়সালের ভাল বন্ধুত্বের কারনে সবাই তাকে সাহায্য করে।সবাই মিলে আন্দোলন করে।যার ফল স্বরুপ পরীক্ষার তারিখ এক মাস পেছানো হয়।ফয়সাল পাগলের মতো খুঁজতে থাকে অবনিকে।একসপ্তাহ পর একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে ফয়সালের নাম্বারে ফোন আসে।ফোনটা ফয়সালের কাছে মনে হল যেন মরুর বুকে এক পসলা বৃষ্টি মতো..
-হ্যালো,(ফয়সাল)
-ফয়সাল,আমি অবনি!(অবনি)
-অবনি!অবনি তুই কোথায়!
কান্না ঝরা কন্ঠে অবনি জবাব দেয়..
-মনে হয়,রাঙামাটিতে আছি!তুই ঠিক বলেছিলি ফয়সাল,রিফাতের নারী পাচারকারী অনেক বড় একটা গ্যাং আছে।আমার খুব ভয় করছে।আমরা পঁয়ত্রিশ জনের মতো আছি এখানে।আজ রাতে আমাদেরকে ওরা পাচার করে দেবে।
-তুই কোনো চিন্তা করিস না।আমি দেখছি।তোর কিছু হবেনা।
ফয়সাল দেরী না করে পুলিশ স্টেশন যায়।ফোন নাম্বারটা অনুসন্ধান করে দেখে কোন টাওয়ারের কাছে আছে।সাথে সাথে সেখানে একদল ফোর্স পাঠানো হয়।আর সন্ধ্যার ট্রেনে করে সাথে সাথে ফয়সালও রওনা দেয় রাঙামাটির উদ্দ্যেশে।রাত আনুমানিক ৮ টা।ফয়সাল ঐ এলাকায় অনেক খুঁজাখুঁজির পর একটা জঙ্গল দেখতে পায়।তার মন বলছিল ওরা জঙ্গলে কোথাও আছে।অন্ধকারে চাদের সামান্য একটু আলোও চারিদিক আলোকিত করে তুলেছে।লতাপাতা ঘেরা জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ সে একটা ক্যাম্পের মতো দেখতে পায়।সেখানে আলো জ্বলছে আর ভেতর থেকে মেয়েদের কান্নার শব্দ শুনা যাচ্ছে।তিনটি তাবু ছিল।যে তাবুটি থেকে মেয়েদের কান্না শুনা যাচ্ছিল ফয়সাল সেই তাবুটির দিকে এগিয়ে গেল।এগিয়ে যেতেই সে দেখলো অবনিকে একটা ছেলে জোড় করে ঐ তাবু থেকে বের করে অন্য একটা তাবুতে নিয়ে যাচ্ছে।সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।তার একটু পাশ দিয়ে যাচ্ছিলো বলে জঙ্গলের ভেতর থেকে বেরিয়েই ছেলেটিকে ধাক্কা দিয়ে অবনিকে নিয়ে ছুটতে থাকে।তাদের পিছু নেয় কয়েকজন।অনেকক্ষন দৌড়ানোর পর অবনি আর দৌড়াতে পারেনা।বসে পড়ে একটা গাছের নিচে।আর সাথে সাথেই ওরা এসে যায় সামনে।রিফাত অবনিকে লক্ষ্য করে একটা গুলি করে।কিন্তু গুলি গিয়ে বেধে ফয়সালের বুকে।অপরদিকে পুলিশও তাদের আশেপাশেই ছিলো।গুলির শব্দ পেয়ে সতর্কবাশি বাজায়।সাথে সাথে ওরা চলে যায়।পুলিশ কাছে এসে ফয়সালকে জিপে তুলে দেয় হসপিটালের উদ্দ্যেশে।অবনির কোলে শুয়ে চাদের আলোর বিপরীতে অবনির চেহারা সামান্য দেখতে পাচ্ছে ফয়সাল।মুখে মৃদু একটা হাসি দিলো..
কান্না ভরা কন্ঠে অবনি বলল..
-তোর কিছু হবেনা ফয়সাল।আমি আছি-তো।সবঠিক হয়ে যাবে।আমরা দু'জন আর আলাদা হবোনা।(অবনি)
-তুইতো এখন আমাকে ছাড়াই এক্সট্রা বুদ্ধিমান হয়ে গেছিস।আরে,আমিওতো একজন ডাক্তার।গুলি হার্টের মধ্যখানে লেগেছে।আমার হাতে আর সময় নেই।শুধু তোকে শেষ কয়েকটা কথা বলতে চাই!(ফয়সাল)
-চুপ কর।
-আজই-তো শেষ!!আরতো চাইলেও কিছু বলতে পারবোনা।তাই আমাকে আজ থামিয়ে রাখতে পারবিনা তুই
-(অঝোরে ঝরছে অবনির চোখের জল।)
-জানিস অবনি!সেই ছোটবেলা থেকেই তোকে আমার সব মনে হয়।তোর সুখ-দুঃখ,হাসি-কান্না সবই আমার মনে হয়।প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই ভালবাসা থাকে।আমার ভেতরেও আছে একজনের জন্য অফুরন্ত ভালবাসা।আর সেই ভালবাসা থেকে তোকে বলছি,আমার মৃত্যুর পর তুই গ্রামে চলে যাস।কারন,এ শহর তোর জন্য নয়।
-কিসের মৃত্যু!তোকে না বলেছি, তুই আমাকে ছাড়া কোথাও যেতে পারবিনা।তুই যেখানে যাবি আমি সেখানেই তোর সাথে চলে আসবো।।
-সেটা কেউ পারেনি,তুইও পারবিনা।আর একটা কাজ করবি!আমি আমার মা-বাবার একমাত্র সন্তান।আমি ছাড়া তাদেরকে দেখার আর কেউ নেই।অনেক ভালোবাসে তারা আমাকে।আমার মৃত্যুর সংবাদ তারা সহ্য করতে পারবেনা।তুই পারলে তাদেরকে একটু দেখে রাখিস।
-তুই কিন্তু বেশি বলতে শিখে গেছিস!
আবার সেই মৃদু হাসি ফয়সালের ঠোটে।হঠাৎ-ই হাসি থেমে যায়,কথা থেমে যায়,নিশ্বাস থেমে যায় সেই ছেলেটার,যে ছিল অবনির জীবনের শেষ প্রদীপ।যে প্রদীপ সবসময় তাকে আলো দিয়ে এসেছে।অবনি আর কাঁদতে পারছেনা।তাই হয়তো জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।সকালে নিজেকে হসপিটালের বিশ্রাম কক্ষে নিজেকে আবিষ্কার করে।ফয়সালের কথা জিজ্ঞেস করতেই একজন ডাক্তার বলল তাকে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।সে তৎক্ষনাৎ গ্রামের উদ্দ্যেশে রওনা দেয়।গিয়ে দেখে ফয়সালের বাবা-মা তার লাশের পাশে অধিক শোকের পাথর হয়ে বসে আছেন।অবনিকে দেখে বাবা উত্তেজিত হয়ে উঠলেন..কিন্তু অবনি যখন বলল,"বাবা,কারো আপনজন হিসেবে আমি মনে হয় যোগ্য নয়।এই পৃথিবীতে একটা অবনির জন্মই হয়েছে মনে হয় দুর্ভাগ্য আর হতাশার এক বিশাল পাহাড় নিয়ে। সেই পাহাড়েই বসবাস করত ফয়সাল আমার সাথে।আজ সেও নেই।কিন্তু সে বলেছিলো, জীবনে একটু সুখ নাকি এখানে পাব।আপনাদের শূন্য বুকে কি আমাকে একটু ঠাই দিতে পারেননা।আমার একটু স্নেহের আশ্রয় দরকার।
-পারব মা,পারব।তুই কি আমাদের হারিয়ে যাওয়া সেই সন্তান হয়ে আমাদের শূন্য বুককে ভরিয়ে দিকে পারবি মা?
-পারব বাবা,পারব।
তারপর অবনি শহরে গিয়ে পরীক্ষা দিয়ে সর্বোচ্চ রেজাল্ট করে।বিভিন্ন দেশে চাকরির অফার আসে কিন্তু অবনি গ্রামে চলে আসে।গ্রামে আসার আগে ফয়সালের সব স্মৃতি ফ্লাট থেকে নিয়ে আসে।ফয়সালের একটা ডায়রির মধ্যে সেই চিঠিটা দেখতে পায় অবনি।যে চিঠি দিয়ে ফয়সাল তার ভালবাসার কথা জানিয়েছিলো অবনিকে।কিন্তু অবনি তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল।
তারপর অনেকগুলো বছর কেটে যায়।এখনও অবনির তিনজনের একটা ছোট্ট পরিবার আছে।সেখানে আছে মা-বাবা আর অবনি।অবনি আজ অনেক ব্যস্ত।চোখে অনেক বড় সাদা একটা চশমা পড়ে।এই ব্যস্ততার মধ্যেও যখন সে তার হসপিটালের একটি রুমের একটি চেয়ারে এসে বসে সেই চিঠি বের করে তখন সাদা চশমার আড়ালে এখনও দেখা যায়
"অবনির চোখের জল"।
.
_[বি:দ্র: ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইল☺]

0 Comments Here
Authentication required

You must log in to post a comment.

Log in
Related Post
StorialTechসুখ - দুঃখের খেলা
সুখ - দুঃখের খেলা

আমার ঘরের কোনে কোনে

টেবিলে চেয়ারে দেয়ালে কড়িকাঠে

সুখ -দুঃখ খেলা করে ।

 

সুখ -..


ছয় রাণীর..
ছয় রাণীর চক্রান্তে তােতা পাখি ছোটদের গল্প

একদিন এক শিকারি শিকারের জন্য গভীর জঙ্গলে ঘুরতে লাগল, এমন সময় শিকারি একটি গাছের ডালে সুন্দর..


StorialTechজীবন সংগ্রাম
জীবন সংগ্রাম

জীবন বহমান 

আছে দুঃখ, আছে কষ্ট 

আর আছে পার্সেল ফেরত আসা কিছু  অতীত ।

তিক্ত রিক্ত..