বডিগার্ড মা

বডিগার্ড মা

আমার নাম নাহিদ..
এই গল্পের শুরু হয়েছিলো বড় ভাইয়ার বিয়ের মধ্য দিয়ে।অনেক দিনের প্রেম কহিনীর পর যখন একটা চাকরি পেলেন তিনি তখন কয়েকদিনের মধ্যে মা-বাবা তাদের বিয়ে দিয়ে দিলেন আর ভাইয়া নাচতে নাচতে বউ নিয়ে বাড়িতে ঢুকলেন।কিন্তু বিয়ের কয়েকদিনের মধ্যেই বোল্ড হয়ে বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে।বউয়ের নাকি ভাল লাগেনা এখানে একসাথে।তারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন আর কেড়ে নিলেন আমার স্বাধীনতা।ভালবেসে বিয়ে করেছিল বলে নাকি আজ ভাইয়া আমাদের মাঝে নেই।এমনটাই মনে করেন মা।তাই আর কোনো প্রেম ভালোবাসা মেনে নেবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন তিনি।আর ভাইয়ার বিদায়ের তৃতীয় দিন থেকে শুরু হয়েছে আমার উপর অত্যাচার। অনেক দিন ধরে আমার আর পাশের বাসার মেয়েটির প্রেমের নেটওয়ার্কে বাফারিং করছিলো।
সেদিন ছাদে উঠলাম মেয়েটিকে দেখে।মেয়েটি আজ আমার দিকে মুখ করে এক দৃষ্টিকে তাকিয়ে আছে।মনে হল মনের মোবাইলের উপরের অংশে ফোরজি প্লাস প্লাস (4G++)লেখা দেখলাম।কিন্তু, কিছুক্ষনের মধ্যেই কানেকশন ফেল(Error)!!
মা এসে আমার সামনে দাড়ালেন।আর সেই মেয়েটিকে এত বকা দিলেন যে সে মনে হয়না আর কখনও কানেক্ট হওয়ার জন্য টাওয়ার খুঁজবে!
-মা,এটা কি করলে!এভাবে কি কেউ কাউকে বকা দেয় নাকি?(আমি)
-তোকে না বলেছি!বিনা সিমে ফোন চালাবি,বিনা মেমরিতে এফ এম শুনবি,।তারপরও তুই ছাদে কি করিস?(মা)
-বাতাস খেতে এসেছিলাম মা।
-চুপ কর,এখন থেকে ঘরের সিলিং ফ্যানের বাতাস খাবি।আর আগামীকাল থেকে আমি তোর কলেজেও যাব।
-মা!দয়া করো,তোমার হাতে পায়ে ধরি।কলেজের সবাই কি মনে করবে।
-কোনো কথা নয়।যাও গিয়ে পড়তে বসো।
মহা-চিন্তায় পড়ে গেলাম আমি।কলেজে গেলে আমার সকল কীর্তি ধরা পড়ে যাবে।অনেক বুঝালাম মাকে,কিন্তু কে কার কথা শুনে।ঠিকই পরদিন আমার সাথে রওনা দিলেন।আমার একেকটা পা ফেলা মনে হচ্ছে হার্টের মধ্যে থর মুভির হাতুরির একেকটা আঘাতের মতো।তারপর কলেজের ভেতরে ঢুকতেই ঘটে গেল সেই কাঙ্খিত ঘটনা।তিনা প্রতিদিনের মতো আজও কলেজের গেইটের সামনে দাড়িয়ে আছে আমার জন্য।ভেতরে ঢুকতেই হাত চেপে ধরল আমার...
-কি রে,এত দেরি করলি কেন?আরে আন্টি,কেমন আছেন আপনি?(তিনা)
আমি মায়ের দিকে একটু তাকালাম।যেন তেলের উপর বেগুন পরল।
-এই মেয়ে,তুমি আমার ছেলের হাত ধরে টানছো কেনো?(মা)
-আসলে আন্টি, প্রতিদিন কলেজ শুরু হওয়ার আগে আমরা কিছুক্ষন ছোঁয়াছোয়ি খেলি-তো, তাই আজও নাহিদের লেট দেখে গেইটের সামনে দাড়িয়ে আছি।
-কি খেলো?
-ছোঁয়াছোয়ি..
-কিভাবে?
-প্রথমজন দৌড়াবে আর দ্বিতীয়জন তাকে ধরার চেষ্টা করবে।যদি দ্বিতীয়জন প্রথমজনকে দৌড়ে ধরতে পারে তাহলে দ্বিতীয়জন দৌড়াবে আর প্রথমজন তাকে ধরতে চেষ্টা করবে।এভাবেই..
-আমার সাথে খেলবে?(মা)
-খেলিস না তিনা।(আমি)
-আরে তুই আমাকে ধরে ফেলিস দেখে আন্টিও ধরতে পারবে নাকি!
-চুপ করো,বাদর মেয়ে কোথাকার।কলেজে পড়তে আসো নাকি বাদরের মতো দৌড়াদৌড়ি করতে আসো।
-আন্টি,আপনি আমাকে বাদর বলতে পারলেন?
-তাহলে কি বলব তোমাকে?
-আমি বাদরের ফিমেল ভার্সন।বাদরনি...
-তবে..রে..(মা)
ধমকের সুর শুনে যে দৌড় দিয়েছে তিনা তাতে আমিও মনে হয় দৌড়ে ধরতে পারবনা।
-মা!তুমি তিনার মতো একটা মেয়েকে এভাবে ধমক দিতে পারলে?(আমি)
-কেনো!কি সমস্যা?(মা)
-তিনা হচ্ছে স্টেডিয়ামের ফ্লাড লাইটের মতো।যে পুরো কলেজকে আলোকিত করে রেখেছে।কলেজের সব ছেলেরা ওর পিছুপিছু ঘুরে।তার সাথে যখন আমি খেলি তখন নিজেকে সালমান খান আর শাহরূহ খান মনে হয়।
-চুপ কর!!আর কখনও নিজেকে সালমান খান আর শাহরূহ খান মনে করবিনা।নিজেকে আলমগীর আর জসীম মনে করবি।যারা সবসময় মায়ের বাধ্য থাকে তাদের অনুসরন করবি।
ধমকশুনে আর কোনো কথা বললাম না।শেষে চড়-থাপ্পর মেরে দিলে কলেজে মান সম্মান কিছু থাকবেনা।
ক্লাসে গিয়ে বসে পরলাম।ক্লাসের বাইরে থাকা আমার জন্য নিরাপদ নয়।ক্লাসের একটা জানালা দিয়ে দেখি মৌসুমি আমার দিকে তাকিয়ে আছে।মৌসুমি আমার নিচের ক্লাসে পড়ে।আজ শুধু চোখে চোখে কথা হচ্ছে।আমি একটু চুলটা ঠিক করে নিলাম।তারপর আবার তার দিকে তাকাতেই চারশত চল্লিশ ভোল্টের শক খেলাম।আমার সমস্ত শরীর কেপে উঠল। মৌসুমী খেয়াল করছে না কিন্তু তার পেছনে মা দাড়ানো।
-এই মেয়ে..(মা)
-জ্বি, বলুন!(মৌসুমি)
-এখানে কি করছো?
-এক জায়গায় ফোন দিচ্ছি।ক্লাসে নেট মিলছে না।তাই এখানে এসেছি..কিন্তু আপনি কে?
-আমি ভাইরাস!!তোমার নেট আর জীবনেও মিলবেনা।কারন,তুমি বন্ধ সিমে ট্রাই করছ।আর কখনও যদি এই নাম্বারে ট্রাই করো তো তোমাকে ব্যান্ড করেদিব।যাও এখান থেকে!
-ঠিক আছে,আর ট্রাই করবো না।কিন্তু আপনি কে সেটা কি জানতে পারি?
-আমি এই সিমের জনক।
হা করে এক দৌড় দিলো মৌসুমি।সাথে আমিও হা করে ক্লাসে বসে আছি।এতদিনের সব পরিশ্রম একদিনে শেষ করে দিলেন মা।আর সহ্য করতে পারলাম না।বেরিয়ে এলাম ক্লাস থেকে..
-মা তুমি মৌসুমিকে এভাবে বকা দিলে কেনো?(আমি)
-সে রং নাম্বারে ট্রাই করেছে।(মা)
-না,মা!এটা রাইট নাম্বার ছিলো।
সাথে সাথে আমার মাথাটা ঘুরতে শুরু করলো।..
-ওহ..এটাতো রং নাম্বার।
মায়ের হাতের জোর যেনো আজ চারগুন বেড়ে গেছে।ভাগ্যেস কলেজের সবাই ক্লাস করতে বিজি।ধীরে ধীরে এভাবেই চলতে থাকে।জীবনের সব ফূর্তি হারিয়ে যেতে থাকে।মোবাইল ফোন অনেক আগেই কেড়ে নিয়েছেন মা।বাকি ছিলো আমার ল্যাপটপ।ক্লাস আর বাসা এভাবে জীবনটা একঘেয়ে হয়ে গেছে।তাই ভাবলাম ফেসবুকে চ্যাটিং করবো।অনেকগুলো মেয়ের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পড়ে আছে।তার থেকে কয়েকটা রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করলাম।নুসরাত ফারিয়া নামের একটা আইডিতে নক করলাম।
-হাই..
নো রিপ্লে..
-হ্যালো
নো রিপ্লে..
অতঃপর কিছু মজার ইমোজি দিলাম।তার মধ্যে দু'একটা চুমোর ইমোজিও চলে গেল ভূল করে.।এবার রিপ্লে আসলো..
-হারামজাদা,আজ তোর একদিন কি আমার একদিন।আজ তোর ল্যাপটপ ভেঙে গুড়ো করবো।তোর বাপ আসুক।এইসব মেসেজ তোর বাপকে দেখাবো।তোর ফেসবুক চালানোও শেষ,ল্যাপটপ চালানোও শেষ।
-আপনি কি করে আমার বাবাকে বলবেন?কে আপনি?
-আমি তোর মা..
-ওহ শিট..
আর কিছু লেখার সুযোগই পেলাম না।দৌড় দিলাম মায়ের ঘরে।
-মা...আমাকে মাফ করে দাও, আমি আর জীবনে এসব করবনা,তোমার পায়ে পড়ি বাবাকে মেসেজগুলো দেখিয়ো না।
-আরে পা ছাড়!কিসের মেসেজ?কি দেখাবো তোর বাবাকে?
-নুসরাত ফারিয়া নামক তোমার ফেক আইডিতে যে ইমোজি-গুলো পাঠিয়েছি,সেগুলো।
-আমারতো কোনো ফেক আইডি নেই।তুই কার সাথে চ্যাট করিস?আমাকে দেখাবি চল..
বাহ..মেয়েটাতো আমাকে ভালোই বোকা বানালো।এরপর থেকে আর আমার ফেসবুক এবং ল্যাপটপ দুইটাই চালানো এক কথায় বন্ধ হয়ে গেল।প্রয়োজনে যদি কখনও চালাতাম তাহলে মা আমার সাথে থাকতেন।তবে মায়ের অনুমতি নিয়ে সেদিন ফেসবুকের ঐ মেয়েটির সাথে কিছুক্ষন কথা বলি।
-একটু কথা বলুন,দয়াকরে।(আমি)
-জ্বি বলুন?(মেয়েটি)
-আপনি আমার সাথে এমন করলেন কেনো?
-বুঝতে পেরেছি,মায়ের কাছে ধরা পরে গেছেন?আসলে আপনাদের মতো ছেলেদেরকে ধরিয়ে দেয়ার জন্যই আমি এই ফাঁদ পেতেছি।ভালই-তো চলছিলো আমার সব। তাহলে শুধু শুধু খারাপ ইমোজি দিয়ে এরকম কেনো করলেন?
-আমার ভুল হয়ে গেছে।আমার মা-ও সামনে আছেন,আমি আমার মায়ের সামনে আপনার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।আমাকে ক্ষমা করবেন প্লিজ।আর আমি কখনও কোনো মেয়ের সাথে এমন ব্যবহার করবো না,আর এমনভাবে মিশবোও না।ভালো থাকবেন
.
-মা আমাকে ক্ষমা করে দাও!আমি এখন থেকে তোমার কথামতো চলব।কখনও তোমার অবাধ্য হবোনা।(আমি)
-আমার সোনার টুকরো ছেলে!আমারও কিছু ভুল হয়েছে।ভালোবাসাতো ভুল বা খারাপ কিছু নয়।তবে জানিস বাবা,কষ্ট লাগে তখনই যখন সন্তান ভালবাসার মানুষের জন্য নিজের মা-বাবাকে ছেড়ে চলে যায়।এত কষ্ট করে যখন তোর মতো সন্তানকে লালন-পালন করে বড় করি জীবনের শেষ মূহুর্তে তোদেরকে নিয়ে একসাথে কিছুদিন ভালভাবে কাটাবো, তখন তোমরা আলাদা হয়ে যাও বউকে নিয়ে।তোরা-তো জানিস না,তখন অনেক কষ্ট হয় আমাদের।তোর ভাই যখন আমাদের ছেড়ে চলে যায়,তখন তোর বাবা আর আমি আমরা সারারাত কেঁদেছিলাম।তুই শুধু আমাদের ছেড়ে কখনও চলে যাস না..
তুই মেয়েদের সাথে বন্ধুত্ব করবি এটাতো খারাপ কিছু নয়।কিন্তু সবার সাথেই বন্ধুত্বের সীমারেখার বাইরে কিছু করাতো ঠিক নয়।(মা)
-হ্যা,মা।তুমি ঠিক বলেছ..
-হুমম...কিন্তু নুসরাত মেয়েটার ব্যবহার আর কথা কিন্তু আমার খুব ভালো লেগেছে...
হা..হা..হা..দুজনেই একসাথে হেসে উঠলাম।
এইতো মা ছেলের সম্পর্ক...
.
_[বি:দ্র: ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইল]

2 Comments Here
  1. 1 year ago
    রিয়াদ আলম

    how funny...nice story!

  2. 1 year ago
    Jumel Hossain

    hi

Authentication required

You must log in to post a comment.

Log in
Related Post
রাজপুত্রের বিয়ে
রাজপুত্রের বিয়ে

আজ অগ্নিদ্বীপের রাজপুত্রের বিয়ে। সমস্ত রাজ্যে তাই উৎসব, এমন সমারােহ কেউ কোনােদিন দেখেনি।

পাত্রী মরকতপুরের রাজকন্যা..


ছয় রাণীর..
ছয় রাণীর চক্রান্তে তােতা পাখি ছোটদের গল্প

একদিন এক শিকারি শিকারের জন্য গভীর জঙ্গলে ঘুরতে লাগল, এমন সময় শিকারি একটি গাছের ডালে সুন্দর..


ব্রেক আপ..
ব্রেক আপ বাহ্যিক জগতে সম্ভব,অভ্যন্তরীণ জগতে নয়!

নীরা কল দিয়েছে।এই মেয়েটা ব্রেক আপ এর পরেও ৩বছর ধরে কল দিচ্ছে।এই মেয়ে কী বোঝেনা ব্রেক..