শিউলি পরীর দেশে রুপকথার গল্প

হাপিত্যেশ করে দাঁড়িয়ে থাকে, শিউলি ফুলের গাছটা, গলিটার মােড়ের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে । খা খা দুপুরে পালতােলা দমকা হাওয়া শরীরে আমেজ আনে, আনে একটা ঘুম ঘুম ভাব। দু-চোখে তন্দ্রা ছড়ায়, কিন্তু ঘুম হয় না। মাঝে মাঝেই চোখ মেলে চায় ।

একটু পরেই গলির মুখে দেখা যাবে সেই ছােট্ট শরীরটাকে, প্রাণচঞ্চল ঢেউয়ের মতাে নাচতে নাচতে স্কুল থেকে ফিরছে । গেটের সামনে এসেই আগে হাতে দুটো ফুল নেবে, দোল খাবে একবার ডাল ধরে, তারপরই মিষ্টি গলায় ডাক ছাড়বে- মা এসে এ গেছি-ই’ তাই সারাটা দুপুর গাছটার কেটে যায় ঐ দিকে চেয়ে । কি বাঁধনেই না বেঁধেছে মেয়েটা ওকে, সারাটা দিনে একবার অন্তত ওকে না দেখলে স্বস্তি পায় না গাছটা। সেবার যখন মেয়েটার খুব জ্বর হয়েছিল অধিকাংশ সময়ে বিছানাতেই পড়ে থাকত, সবাই খুব দুশ্চিন্তায় পড়েছিল। শিউলি গাছটার চোখে ছিল না ঘুম। মাটির সাথে আটকে থাকা শরীরটাকে যতটা সম্ভব ঝুঁকিয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে দেখার চেষ্টা করত মেয়েটাকে। অন্তরের সমস্ত আকুতি দিয়ে প্রার্থনা করত ভগবানের কাছে, মেয়েটি যেন সেরে ওঠে, এই কটা দিন প্রচণ্ড ক্লান্তিতে, দুর্ভাবনায় সে একটি ফুলও ফোটায়নি, যারা রােজ সকালে ফুল তুলতে আসত তারা অবাক হয়ে ভাবতে লাগল যে, এতসুন্দর তাজা ফুল গাছটা বুঝি বােধ হয় মরেই গেল, কিন্তু সেদিন যখন একটু সুস্থ হয়ে মেয়েটি তার মায়ের হাত ধরে বেরিয়ে এল বাইরে, আর বেরিয়েই সটান এগিয়ে এল গাছটার কাছে, আহত অভিমানী স্বরে বলে উঠল “দেখেছাে মা!“ গাছটা একটা ফুলও আমার জন্য রাখেনি', গাছের ভাষা অন্য কেউ বুঝতে পারে

তাই । না হলে দেখত যে, শিউলিগাছটা সেদিন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদেছিল, সমস্ত ডালপালা পরমস্নেহে বুলিয়ে দিয়েছিল তার গায়ে।

যখন প্রচণ্ড গরমে সমস্ত সবুজ পুড়ে ছাই হয়ে যায়, গাছে ফোটেনা ফুল, তৃষ্ণায় সমস্ত শরীর যখন মরুভূমি হয়ে যায় তখন এই মেয়েটি বুঝতে পারে তার কষ্ট, জল ঢালে তার গােড়ায়। লােকে বলে 'ফুলের মতাে সুন্দর। গাছটা ভাবে এটুকু বললে কম বলা হয়। মেয়েটির সৌন্দর্য ফুলের চেয়েও গভীর। আকাশের চেয়েও বিস্তৃত, পাপড়ির চেয়েও নরম। তাই পরদিন সকালে মেয়েটি যখন ফুল তুলতে এসেছিল গাছটি ওর জন্য ফুটিয়ে রেখেছিল নিজের সেরা সবটুকু। ঝর ঝর করে ঝরিয়ে দিয়েছিল ওর সারা গায়ে, মাথায়। ভরিয়ে দিয়েছিল শুভ্র ফুলের চুম্বনে। | স্কুল থেকে ফিরে বিকেল বেলায়, সঙ্গী সাথীদের সঙ্গে খেলে মেয়েটি। গাছটি দেখে, ওকে ঘিরে বাচ্চাগুলাের চোর চোর খেলা, হুটোপাটি, হইচই, দেখে আর দেখে, এত দেখেও মন আর ভরে না। তার। ধীরে ধীরে নববধূর ঘােমটার মতাে সন্ধ্যা নামে। মাঝে মাঝে। জানালার ফাক দিয়ে চাঁদের কণা এসে পড়ে মেয়েটির ঘুমন্ত মুখে। জ্যোৎস্নার ঠুকরােটাকে গাছটার হিংসে হয়। এইভাবে এক সুরেলা। তন্দ্রায়, আবেশে, রাক কেটে যায়। ঊষার প্রত্যাশায়, ফুলের ডাল। নিয়ে দাড়িয়ে থাকে গাছটি। মেয়েটি আসে, ফুল তােলে, গাছটার প্রাণ ভরে দিয়ে যায়। | এইভাবেই দিন কাটছিল বেশ, কিন্তু নীর আকাশেও দাগ কাটে কালাে মেঘের ময়লা। একদিন এক সাধু আসে ওদের বাড়িতে। মেয়েটি বাইরে আসে ভিক্ষা দিতে। মেয়েটিকে দেখে সাধুটার চোখ চকচক করে ওঠে। ভিক্ষে নিয়েই সে চলে যায় না, সিঁড়িতে বসে জল চায়। সাধুর চকচকে চোখ দুটো দেখেই কেমন যেন লেগেছিল গাছটার ।ওঁকে বসেত দেখে সন্দেহটা বাড়ে। ব্যগ্র হয়ে কান পেতে থাকে। মেয়েটি জল নিয়ে এলে সাধুটি বলে ‘মামনি, তােমার তারাদের দেশে যেতে ইচ্ছে করে না?' মেয়েটি বলে হ্যা! খুব করে। কেন তুমি সেখানে গেছ?’ সাধু বলে ‘হ্যা, আমি তাে সেখানেই থাকি।'

- সেখানে কি আছে?

- “কি নেই? তুমি যা চাও সব আছে। হীরে, মণি-মাণিক্য, সুন্দর সুন্দর খাবার, গয়না, পােশাক ওখানে কখনাে অন্ধকার হয় না। সবসময় আলােয় ভরে থাকে। গরমও নেই ঠাণ্ডা দুঃখও নেই, কষ্টও নেই। সে এক ভারি সুন্দর জায়গা। একবাদ গেলে আর আসতে ইচ্ছে করে না। তুমি যাবে সেখানে ভs সাথে?' মেযেটির চোখদুটো আনন্দে ঝিকমিকিয়ে ওঠে ।

-হ্যা, কিন্তু মা তাে আমায় যেতে দেবে না। আর তাছাড়া আs কি করেই বা যাব? সাধুটি গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল ‘তােমার মাকে এখন কিছু বলার দরকার নেই। ওখান থেকে ঘরে এসে সবাইকে চমকে দেবে। কেমন?' হঠাৎ কি যেন মনে পড়ে যাওয়ায় মেয়েটি প্রশ্ন করে, আচ্ছা, সেই সেখানে ফুল আছে?

-“হ্যা, কতাে ফুল । তুমি ফুল বুঝি খুব ভালবাস?

-“খুব। আমাদের এই গাছটায় না ভারি সুন্দর শিউলি ফুল ফোটে। সাধুটি গাছটির দিকে একবার অবজ্ঞাভরে তাকায়, তারপর বলে এ আর এমন কি! আমাদের ওখানে এমন সব ফুল আছে যা তুমি চোখে কখনাে দেখনি। তবে শুনে রাখাে কিভাবে সেখানে যেতে হয়। পূর্ণিমার রাতে আমি তােমাদের ছাদে একটা জ্যোৎস্নার সিঁড়ি নামিয়ে দেব, তুমি ওই সিড়ি বেয়ে সােজা উঠে। চলে যাবে। চাদের দেশ পার হলেই আমি তােমাকে নিয়ে নেব । তাহলে আজ চলি, কেমন? কাউকে কিন্তু কিছু বলাে না। মনে রেখ, পূর্ণিমার রাতে?’ সাধুটি হন হন করে হারিয়ে যায়। যেহেতু শিউলি। গাছটির অন্তর্দৃষ্টি মানুষের মতাে লােভ লালসার ক্লেদে চাপা পড়েনি। সেহেতু সে অচিরেই বুঝতে পারে যে সাধুটি ছদ্মবেশি। আসলে সে। এই পৃথিবীর মানুষ নয়। মেয়েটিকে খুব পছন্দ হওয়ায় তাকে তারার দেশে ভুলিয়ে নিয়ে যাওয়ার তালে আছে। উত্তেজনায় গাছটির শরীর শক্ত হয়ে ওঠে। থর থর করে কাপতে থাকে। সমস্ত রাত কাটে বিনিদ্র। কিছুতেই ভেবে পায়না কি সে করতে পারে। শুধুমাত্র তার মনের একান্ত অমূল্য রতনটি চলে যাবে এই ভেবেই তার সমস্ত অন্তরাত্মা ব্যথায় অবশ হয়ে যেতে থাকে। একের পর এক দিন কেটে যায়। পূর্ণিমা যত কাছে আসে গাছটিও তত শীর্ণ হতে থাকে, ফোটে না কোন ফুল। মেয়েটির আজকাল আর তার কাছে আসে । সে তার নতুন দেশের স্বপ্নেই মশগুল।

অবশেষে পূর্ণিমা আসে। মেয়েটি ভােরবেলা থেকেই প্রবল উত্তেজনায় আবেগে ছটফট করতে থাকে। অন্যদিকে সূর্য যতই পশ্চিমদিকে এগােয় গাছটির সব পাতা একে একে ঝরে যায়।। অবশেষে সে এক প্রাণহীন কঙ্কালের মতাে একলা দাঁড়িয়ে থাকে। ধীরে ধীরে রাত গভীর হয়। মেয়েটি চুপিসারে বিছানা ছাড়ে। ছাঁদে। যায়। আকাশ থেকে নেমে আসে এক অলৌকিক সিঁড়ি। চাঁদের আলােয় গড়া। মেয়েটি পা রাখে সিঁড়িতে, ক্রমশঃ উপরে উঠে। যেতে থাকে। সিগ্ধ আলােয় শািশরের মতাে ঝলমল করে তার ।

শরীর। সমস্ত ঘটনার নীরব সাক্ষী গাছটি। আর পারে না। তাছ সমস্ত অস্তিত্বকে যেন টান মেরে উপড়ে ফেলতে চায়। সমস্ত হৃদয়। এক শব্দহীন আর্তনাদে হাহাকার করে ওঠে। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় কম্পনে। তার শরীরে ভেঙে গুঁড়াে গুড়াে হয়ে যায় অণুতে পরমাণুতে। নিজের। অদম্য ভালােবাসা আর ইচ্ছার জোরে সে হয়ে যায় মেঘ, উড়ে যায়। মেয়েটির ফেলে যাওয়া পথ ধরে, দাঁড়ায় গিয়ে মেয়েটির সামনে। হঠাৎ মেঘটিকে দেখে মেয়েটি অবাক হয়। বলে একটু সরাে। আমাকে তারাদের দেশে যেতে হবে। মেঘটি সরে না। মেয়েটি আবার বলে- ‘দয়া করে একটু সরাে। আমাকে মায়াবি আলাের। দেশে যেতে দাও।' মেঘ কোন উত্তর করে না। কেবল তার শরীর থেকে নিঃসৃত হয় এক পরিচিত তীব্র সুবাস, শিউলি ফুলের। সেই গন্ধে শরীর মন মাতােয়ারা হয়ে যায় মেয়েটির, কেটে যায় সব। সম্মােহন। জেগে ওঠে নিজের একান্ত আপন বাড়ি, বাবা-মা, সঙ্গীসাথী এমন কি সেই শিউলি গাছটার স্মৃতিও। আকুল আবেগে সে জড়িয়ে ধরে মেঘরূপী শিউলি গাছটাকে। তার শরীরের তার ভালবাসার উষ্ণতায়, প্রচণ্ড তৃপ্তিতে শিউলি মেঘ গলে যায়, টুপটাপ ঝরে পড়ে।

পরদিন সকালে, সকলে ফুল তুলতে এসে অবাক হয়ে দেখে, শিউলি গাছটা আর নেই। তার জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র। শ্বেতশুভ্র শিউলি ফুল, তাদের গায়ে অশ্রুজলের মতাে বড় বড় শিশিরের ফোটা।

- আবুল কাশেম রহিমউদ্দীন

0 Comments Here
Authentication required

You must log in to post a comment.

Log in
Related Post
ব্রেক আপ..
ব্রেক আপ বাহ্যিক জগতে সম্ভব,অভ্যন্তরীণ জগতে নয়!

নীরা কল দিয়েছে।এই মেয়েটা ব্রেক আপ এর পরেও ৩বছর ধরে কল দিচ্ছে।এই মেয়ে কী বোঝেনা ব্রেক..


StorialTechসুখ - দুঃখের খেলা
সুখ - দুঃখের খেলা

আমার ঘরের কোনে কোনে

টেবিলে চেয়ারে দেয়ালে কড়িকাঠে

সুখ -দুঃখ খেলা করে ।

 

সুখ -..


পিন্টু মিয়ার..
পিন্টু মিয়ার ছ্যাঁকা

ইদানীং পিন্টু ভাই ছ্যাঁকা খেয়ে আমার সাথে বেশি ভাব সাব করে বসছে।

পিন্টু ভাই হচ্ছে এলাকার..