খুদে টুনটুনির গল্প

বাপ মা তার নাম রেখেছিল টুনটুনি । মা তাকে আদর করে ডাকত খুদে টুনটুনি। খুদে টুনটুনি খুদেই আছে এখনও,

মার মিষ্টি মুখখানা তার একটু একটু মনে পড়ে যেন স্বপের মত। বাবাকে কিন্তু তার মনেই পড়ে না। কোন কুলে কেউ আর নাকি এখন নেই তার। এত বড় পৃথিবীতে খুদে টুনটুনি একেবারই একা। কবে কেমন করে যে বেচারা তাতী আর তাতিনীর খপ্পরে পড়েছিল, তা সে জানে না। দয়া মায়ার লেশও নেই তাদের মনে। দু’বেলা দু’ বাটী সাতবাসী পান্তা আর এক ছিটে নুন তাকে খেতে দেয় আর উদায়স্ত হাড়ভাঙা খাটায়। 

চরকায় সুতাে কাটা, তাতে কাপড় বােনা, কাপড় ধােলা বেলনে পরিপাটি ক র গুছিয়ে রাখা, তারপর আবার হেঁসেল কে বাসন মাজা, বাটনা বাটা- গােয়াল বাড়ি গােধূলির সব কাজ করে মুখ বুঝে। তবু একটা মিষ্টি কথা নেই তাদের মুখে।

পান থেকে চুন খসলেই দেখে কে তাদের তম্বি। তাতী চোখ লাল করে বলে- মুখে নূড়াে জ্বেলে দিতে হয় অমন হাভাতে মেয়ের। তাতিনী ঝাটা হাতের মারমুখী হয়ে তেড়ে আসে। মুখ ভেং। চিয়ে বলে, খেং ড়িয়ে ভেঙে দিতে হয় ও পােড়ার মুখ ।।

এইভাবে চোখে জলে ভাসতে ভাসতে দিন যায় বেচারা টুনটুনির ।

তাঁতী আর তাঁতিনীর ছিল তিন মেয়ে। বড় মেয়ে এক চোখা... মেজ মেয়ে দু' চোখা...... আর সবার ছােটটি তিন..... চোখা। তিনটে মেয়ে কুঁড়ের ধাড়ী।

সংসারের কুটোটি ছিড়ে দু’ ভাগ করে না। কেবল বসে বসে। খায় আর পায়ের ওপর পা দিয়ে রাজা উজীর মারে ।

একদিন হয়েছে কি? – তাতীর ধবলী গাইটাকে টুনটুনি রােজ। যেমন নিয়ে যায়, সেদিনও তেমনি মাটে নিয়ে গেছে চরাতে । গাইটাকে সে প্রাণ ঢেলে ভালবাসে আর গাইটাও যেন বুঝত তা।। টুনটুনি যত কিছু দুঃখের কথা হত ধবলীর সঙ্গে।

সেদিন টুনটুনি ধবলীর গলা জড়িয়ে খুব আদর করে বললে, ধবলী ভাই, আর যে পারি না নিত্য ওদের জুলুম সহ্য করতে। হাড় কালি হয়ে গেল দিন ভাের খেটে, তবু মন পাই না ওদের।..... সারাদিন কেবল মুখ ঝামটানি আর বেদম মার। খিদে পেলে যদি কাদি, তা হলে আর রক্ষা নেই। ......... একরাশ তুলাে দিয়েছে। কালকের মধ্যেই বাটনা বেটে, তত বুনে, বােনা কাপড় ধােলাই করে, বেলনে গুটিয়ে ফেলতে হবে.... কেমন করে বলতাে ধবলী গাই? বলতে বলতে ছলছল করে উঠল তার দুটি চোখ ।

ধবলী তাকে সান্তনা দিয়ে বললে, “ভেবাে না টনটুনি ভাই.... তুমি এক কাজ কর...... আমার একটা কানের মধ্যে সুড় সুড় সেধিয়ে যাও আর বেড়িয়ে পড় আর এক কান দিয়ে। ব্যাস, তাহলেই তােমার সব কাজ ফতে। আর কিছুই করতে হবে না তােমাকে। টুনটুনি তাে শুনে অবাক।

 

বললে,-সত্যি?

ধবলী বললে- হ্যা ভাই হ্যা, যা বলেছি তা করেই দেখনা একবার।

ধবলী যেমন বলেছিল, টুনটুনি তখন ঠিক তাই করলে। তার এক কানের মধ্যে ঢুকে পড়ল আর বেরিয়ে এল আর এক কান দিয়ে।

বেরিয়েই দেখে, তাই তাে, সত্যিই তাে, আগে যেখানটায় যে তুলাে রেখে দিয়েছিল সেখানে তুলাের বদলে রয়েছে তাতে বােনা। একখানা চমৎকার ধােলাই করা ধবধবে কাপড়, বেলনে দিব্যি করে জড়ান।...

দেখেই তাে সে আহ্লাদে আটখানা। খুশিতে নাচতে নাচতে সে। জড়ান কাপড় নিয়ে সটান তাতিনীর সামনে গিয়ে হাজির।

তাতিনীর হাড় তাে জ্বলে গেল তাকে দেখে। সে আর কিছু না বলে, মুখখানা হাঁড়ির মত করে কাপড়টা একটা পেঁটরার মধ্যে। তুলে রাখলে আর টুনটুনিকে আরও বেশি বেশি তুলাের কাঁড়ি দিয়ে। ধমক দিয়ে বললে, – যা এ গুলাে নিয়ে যা...। আর একখানা বেশি। মিহি কাপড় বুনে ফেলবি আরও আরও তাড়াতাড়ি। দেরি হলে তাের হাড় এক ঠাই নয়, মনে থাকে যেন।

টুনটুনি সেই তুলাের গাদা নিয়ে ছুটল ধবলীর কাছে। ধবলীর। কথামত সে আগরে মত এক কান দিয়ে ঢুকল আর অন্য কান দিয়ে এল বেরিয়ে। তারপর তুলাের বদলে বেলুনে জড়ানাে ধবধবে। তাঁতের কাপড় নিয়ে এলাে তাতিনীর কাছে। | তাতিনী মুখ হাড়ি করে কাপড়টা পেটরার মধ্যে তুলে রেখে আবার একগাদা তুলাে নিয়ে টুনটুনিকে বললে, বেশ ভাল একখানা কাপড় বুনবি এবার। দেরী করবি না কিংবা তারাহুড়াে করতে। গিয়ে কাজ খারাপও করবি না। কাপড় মনের মত না হলে, তাের। একদিন কি আমারই একদিন।

টুনটুনি সেই তুলাের গাদা নিয়ে হাজির হল ধবলীর কাছে। এই ভাবে দিন যায় । তাতিনী টুনটুনিকে কাঁড়ি কাঁড়ি তুলাে দিয়ে জব্দ করতে চায়, ততই জব্দ হয়ে যায় সে নিজে।

 

শেষে একদিন সে তার বড় মেয়ে এক চোখাকে ডেকে বললো, কুঁড়ের ধাড়ী সে হাবাতে মেয়েটা যে কি করে মা বাটনা বাটে কে, তাঁত চালায় কে, কাপড় কে দেয় গুটি চোখ সােনা, দেখে আয়তাে মা, তার সাথে গিয়ে। এক চোখা টুনটুনির সাথে একদিন সকালে গেল মাঠে।

 

একেই তাে সে ঘুম কাতুরে,

তার ওপর শীতের সকাল।

 উঠতেও হয়ে ভাের ভাের,

এখনও ঘুম লেগে রয়েছে তার চোখে.....।

সবুজ ঘাসে তারা মাঠের ওপর সে আরাম করে রােদ পােষ পােয়াতে তার টুলনি এলাে।

সে গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে ঝিমুতে লাগল। তাই দেখে টুনটুনি তার চোখের ওপর হাত নেড়ে সুর করে বলল – “এক চোখা দিদিমণির এক চোখ ভরি , ঘুম দাও, ঘুম দাও, ওগা ঘুমবুড়ী।”

 

যেমন এই কথা বলা, অমনি রাজ্যের ঘুম নেমে এলাে তার। চোখে । সে চোখ বুজিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

সেই ফাকে টুনটুনি রােজকার মত ধবলীর এক কানে ঢুকে আর। এক কান দিয়ে বেরিয়ে এলাে, দেখল তার তুলাে থেকে তৈরি। সুতােয় বােনা ধবধবে পরিষ্কার একখানা তাঁতের কাপড় পরিপাটি করে জড়ান রয়েছে বেলনে।

সে তখন সেই কাপড় এনে দিল তাতিনীর হাতে।

তাতিনী দেখল তার বড় মেয়েকে দিয়ে অভীষ্ট সিদ্ধ হল না। তাই এবার সে মেজ মেয়ে দু’চোখাকে ডেকে চুপিচুপি বললে,| কুঁড়ের ধাড়ী সে হাবাতে মেয়েটা কি যে করে মাঠে গিয়ে...।

বাটনা কাটে কে, তাঁত চালায় কে, কাপড় কে দেয় গুটিয়ে...

দু চোখ সােনা, দেখে আয় মা, তার সাথে গিয়ে! এবার। টুনটুনির সাথে মাঠে চলল দুচোখা মেজমেয়ে....।

কিন্তু সেও ঘুম কাতরে কম নয়। এক চোখা বড়দিদির মতাে। সেও একটু পরে ঘাসে বসে মাঠের ওপর ঘুম ঢুল ঢুল হয়ে শুয়ে পড়ল। তাই দেখে টুনটুনি তার চোখের ওপর হাত রেখে বলল,

 

“দুই চোখা দিদিমণির দুটি চোখে ভরি। ঘুম দাও, ঘুম দাও, ওগাে... ঘুম পরী।”

তার মুখের কথা শেষ না হতেই দু’চোখার চোখের পাতা ভারি হয়ে উঠল। দু’চোখ বুজে অঘােরে ঘুমিয়ে পড়ল।

সেই সুযােগে টুনটুনি তার কাজ হাসিল করে দিলে, তারপর রােজকার মতাে বেলনে জড়ান ধােয়া ধবধবে তাঁতের কাপড় এনে। দিলে তাতিনীকে।

মেজ মেয়েকে দিয়েও কোন কাজ হল না দেখে রাগে রি রি করতে করতে তাতিনী এবার পাহাড় প্রমাণ এক তুলাের বস্তা ধপাস করে চাপিয়ে দিলে বেচারা টুনটুনির ঘাড়ে। দিয়ে বললে, - কাপড়ের বনুন যদি আরাে মিহি আর ধােলাই যদি আরাে ভাল না হয় তাে- তাের আদিখ্যেতা জন্মের মতাে ঘুচিয়ে দেব, এই বলে দিলাম।

তারপর সে তার ছােটমেয়ে- তিন চোখাকে আড়ালে ডেকে বললে- কুঁড়ের ধাড়ি ও হাবাতে মেয়েটা কি করে মাঠে গিয়ে, বাটনা বাটে কে, তাঁত চালায় কে, কাপড় কে দেয় গুটিয়ে.... তিন চোখ সােনা, দেখে আয় তাে মা, তার সাথে গিয়ে। এবার তাে মেয়ে চলল টুনটুনির সাথে । মাঠে দিয়ে সে মনের আনন্দে সে রােদে খুব ছুটোছুটি করল । তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে ক্লান্ত শরীরটাকে এলিয়ে দিলে ঘাসের উপর।

টুনটুনির সেদিন কি জানি কি হল, তার চোখের ওপর হাত নাড়তে নাড়তে ভুল করে সে বললে,

 “তিন চোখা দিদিমণির দুই চোখ ভরি,

ঘুম দাও, ঘুম দাও, ওগাে ঘুম পরী” |

 

এমনি যেমনি বলা অমনি তার দু’চোখ ঘুমে বুজে গেল বটে, কিন্তু আর একটা চোখ দিয়ে পিটপিট করে দেখতে লাগল কেমন করে টুনটুনি ধবলীর এক কান দিয়ে ঢুকে আর এক কান দিয়ে বেরিয়ে আসে, আর কেমন করে ভােজবাজির মত তুলাের বদলে । বেলুনে জড়ান তাতে বােনা সাদা ধবধবে কাপড় হাতে নিয়ে সে বাড়ি ফেরে।

 

তিন চোখার মুখে সব কথা শুনে আর এতদিন সব কথা জানতে পেরে তাঁতিনীর তাে মহা আনন্দ।

সে তখনই তাঁতীকে বললে,- কালই নিকেশ কর বজ্জাতে ধাড়ী ওই গাইটিকে।

তাঁতী আমতা আমতা করে কি বলতে যাচ্ছিল, তাতিনী বos দিয়ে উঠল- না না তুমি বাপ আর কাঁদুনি গাইতে এস না ওর তল আর একদিনও দেরী না করে কালই খতম করে দাও ও-পাপটাকে ।

তাতী আর কি করে মস্ত একটা ছােরা নিয়ে বসল শানাতে।

আড়াল থেকে তাই দেখে টুনটুনির চোখ তাে চড়কগাছ! কাঁদ। কাঁদ হয়ে সে তখুনি ছুটল মাঠে।

সেখানে গিয়ে ছলছল চোখে ধবলীর গলা জড়িয়ে ধরে সে বললে, “কি হবে ধবলী ভাই, তাতী যে কাল তােমাকে কেটে ফেলবে ঠিক করেছে। তাদের কি হবে বল না । বলে সে ফুপিয়ে। ফুপিয়ে কাঁদতে লাগল...। | তাকে অমন ভাবে কাদতে দেখে ধবলী বললে, টুনটুনি ভাই, আমার জন্যে কেঁদনা। যা বলি তাই শােন এখন। আমাকে ওরা যখন কেটে ফেলবে, তুমি তখন করবে কি আমার হাড়গুলাে সব একটা ন্যাকড়ায় বেঁধে নিয়ে গিয়ে তার বাগানের এক কোণে পুঁতে দেবে। তারপর রােজ সকালে জল দেবে তুমি।..... কেমন মনে। থাকবে তাে আমার কথা।

সে কথার জবাব দিতে গিয়ে টুনটুনির গলা ভারী হয়ে এলাে ।।ভেউ ভেউ করে কাঁদতে রাগলাে সে।

তাতিনীর কথার নড়চড় হল না। তার কথা ঠেলতে না পেরে তাঁতী পরের দিন সকালেই কেটে ফেলল ধবলীকে।

টুনটুনি কাঁদতে কাঁদতে ধবলীর হাড়গুলাে একটা ন্যাকড়ায়। বেঁদে বাগানে নিয়ে গিয়ে এক কোণে পুঁতে ফেলল। আর রােজ সেখানটায় জল দিতে লাগল।

জল দিতে গিয়ে একদিন সে দেখল একটা চারাগাছ হয়েছে। দিনে দিনে সেই গাছ যখন বড় হল, গাছ ছেয়ে গেল কনক চাপা ফুলে ।.... টুনটুনি অবাক হয়ে দেখলে গাছের ডালগুলাে সব রূপাের আর পাতাগুলাে সব সােনার।

 

ঝিরঝিরে বাতাসে সেই ডালগুলাে যখন দুলতে থাকে, রােদুরে ঝকমক করে সােনার পাতাগুলাে আর কনকচাপার গন্ধে ম-ম করে সারা বাগান, তখন সে কি শােভা। বাগানের আশপাশ দিয়ে যে যায়, সেই ‘থ’ হয়ে চেয়ে থাকে সেই গাছের একদিন কি হয়েছে.....

এক চোখে... দু’চোখা।

আর তিন চোখা তিন বােন সেজে গুজে বেড়াচ্ছে সেই গাছতলায়। বাগানের পাশ দিয়ে চলেছেন এক পরম-সুন্দর রাজপুত্র। তিনি বললেন,

“রূপের ডালে সােনার পাতা তিনকন্যা তার তলায়, গাছের ফুল যে আনবে পেড়ে, মালা দেব তার গলায় ।

ভিন রাজ্যের রাজার ছেলে, মুখস্পর্ষ কহিলাম, রাজার ঘরে রানীর আদর পাবে কন্যা আমরণ।” যে আগে ফুল তুলে আনতে পারবে সেই হবে রাজপুত্রের ঘরণী। রাজপুত্রের মুখে যেমনি এই কথা শেষ হয়েছে অমিনি তিন বােনের ভো দৌড়!

| গাছের নীচের দিকে গাছে যে ফুলগুলি ফুটেছিল, মরি বাচি করে। ছুটে গেল তারা সেইগুলাে তুলেতে। যেই তারা হাত বাড়িয়েছে ফুল তুলতে অমনি সরসর করে ফুলভরতি ডালগুলাে উঠে গেল তাদের নাগালের বাইরে। ডালপালা ধরে তারা যত টানাটানি করে ডালগুলাে ততই কখনও যায় তাদের খোপায় আটকে... কখনাে বা জামায়। দেখতে দেখতে জামা ছিড়ে ফর্দাফাই হয়ে গেল, খোপা লণ্ডভণ্ড, হাত কেটে, ছিড়ে রক্তে লাল।

নাজেহালের এক শেষ হয়েছে যখন তারা, তখন সেখানে এল টুনটুনি। সে ধবলীকে মনে মনে একবার স্মরণ করে গাছের কাছে। গিয়ে হাত বাড়াতেই সরসর করে নেমে এলাে ঝুলন্ত ডালগুলাে। সে অঞ্জলি ভরে ফুল নিয়ে রাজপুত্রকে দিলে।  তারপর একদিন ধূমধাম করে টুনটুনির বিয়ে হল রাজপুত্রের সাথে। আজন্ম দুঃখ-কষ্ট কতই ভােগ করার পর এতদিনে সে রাজপুত্রের ঘরণী হয়ে মনের সুখে ঘরকন্না করতে লাগল।

0 Comments Here
Authentication required

You must log in to post a comment.

Log in
Related Post
StorialTechPet Friendly Treatment Centers – Read True Reviews Now!
Pet Friendly Treatment Centers – Read True Reviews Now!

Orange County, Ca (18-Nov-2020) In the current time period, there are numerous individuals who are hooked..


অনুতাপ
অনুতাপ

সাজু স্যারকে আমার খুব বিরক্ত লাগে।মনে হয় মুখে একটা কালো কাপর বেঁধে রাতের অধারে গিয়ে মেরে..


প্রেমের ফাঁদে..
প্রেমের ফাঁদে (পূর্ণদৈর্ঘ্য শেষ অংশ)

-এই যে শুনুন।(আমি)
-জ্বি ম্যাডাম বলুন।(নাহিদ)
-এই নিন আপনার ছাতার টাকা।
-মানে!!
..