ছোটদের গল্পঃ রাজার ছেলের সঙ্গে রাজকন্যার বিয়ে

ছোটদের গল্পঃ রাজার ছেলের সঙ্গে রাজকন্যার বিয়ে

এক

রাজার ছেলে মােহনলাল স্বপন দেখে ঘুম থেকে উঠেছে, কৃষ্ণপুর রাজ্যের রাজকন্যা ময়নামতী যেন তাকে বিয়ে করেছে। কৃষ্ণপুর রাজ্য যে কোথায় তা-ই তাে সে জানে না, তায় আবার সেই দেশের রাজকুমারী ময়নামতী- যার রূপের  গর্বে মাটিতে পা পড়ে না- তাকে সে দেখবে কি করে!

ভাবল তাকে যখন সে স্বপনে দেখেছে আর তার সাথে তার বিয়েও হয়েছে, কাজে কাজেই তাকে যে করেই হােক খোজখবর করে বের করা চাই-ই, - আর তাকে ছাড়া অন্য কাউকে সে জীবনে বিয়েই করবে না।

 

হরিণ শিকারের নাম করে একদিন রাজা আর রাণীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে একটা বনের মধ্যে এসে ঘােড়াটা ছেড়ে দিলে। দিয়ে, রাজপােশাক খুলে একটা পোটলা বেঁধে নিয়ে সাধুর বেশ পরে পথ চলতে লাগলে।

দুপুরের রােদ মাখার ওপরে ঝা ঝা করছে, কাক পক্ষীর রা নেই। যেতে যেতে এক রাজার রাজ্য ছেড়ে আর এক রাজার রাজ্য। বনের মধ্যে মস্ত একটা বটগাছ, - সেই গাছের ছায়ায় মােহনলাল ক্ষিদেয় তেষ্টায় কাতর হয়ে শুয়ে পড়লাে । পড়তেই অঘােরে ঘুম।

যখন প্রায় বেলা ডােবে, এমনি সময়ে তার ঘুম ভাঙলে । ঘুম ভাঙতেই সে শুনতে পেলাে, গাছের ওপর এক শুক পাখি শারীকে। বলছে, “আজ এই রাজপুত্রের নিশ্চয় মরণ হবে।”

শারী জিজ্ঞেস করলে, “কেন?”

সে বললে, “এক্ষুণি একটা বাঘ আসবে, এসেই রাজপুত্রকে খেয়ে ফেলবে।” “আহা, তবে তাে খুব দুঃখের কথা! তা একে কোন রকমে বাঁচানাে যায় না?”

“নাঃ, তা কি করে হবে ; তবে একটা উপায় হতে পারে। বাঘটা আসতেই যদি রাজপুত্র তাকে ‘মামা' বলে ডেকে কাছে যায় তা হলে সে আর কিছু বলবে না।”

 

দুই 

নিচে থেকে রাজপুত্র সব শুনতে পেয়ে আগে থেকেই তৈরি হয়ে বসে রইলাে। এদিকে খানিক পরে বন-বাদাড় কাঁপিয়ে ‘হালুম ‘হালুম করে একটা বাঘ ঝােপের মধ্যে আসতেই রাজপুত্র উঠে তাকে একটা প্রণাম করলাে। বললে, “কি মামা কেমন আছাে?”

বাঘ তাে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। এ বলে কি! মানুষ আবার তার বােনপাে হবে কি করে! বেচারী খানিকক্ষণ অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে আমতা আমতা করে বললে, “তা ভাগ্নে কেমন আছাে? আমাদের বাড়ি চলাে।”

 

বাঘ তাকে সাথে করে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেল। বাঘের ছেলেপুলেরা একজন মানুষ ভাই পেয়ে তার গা চেটে আনন্দ। জানাতে লাগলে। বাঘিনী তাকে আদর করে মরা গরুর একটা ঠ্যাং তাকে খেতে দিলে । রাজপুত্র দু' একদিন তাদের কাছে থেকে, বাঘ, বাঘিনী আর তার ছেলেপুলেদের কাছে বিদায় নিতে গেল।

তারা বললে, “যদি কোনাে বিপদ আপদ হয়- ‘মামা মামা’ বলে ডেকো তাহলেই আমরা গিয়ে হাজির হবাে।”

রাজপুত্র স্বীকার করে তাদের সবাইকে নমস্কার জানিয়ে আবার পথ চলতে শুরু করলে । দিনের পর রাত আসে রাতের পর দিন। এমনি করে কত মাস যে যায় তার ঠিক নেই। অবশেষে একদিন সে কৃষ্ণপুর রাজ্যে এসে হাজির হলাে।

 

তিন 

রাজার বাড়িতে সে দিন খুব ধুমধাম- লােকজনের হৈ চৈ বাদ্যিভাণ্ডে রাজ্যিটা সরগরম। এক গোয়ালানী দুধের ভাঁড় মাথায় করে সেই পথে যায়। রাজপুত্র তাকে জিজ্ঞেস করে খোঁজ পেলে যে, সেই দেশের রাজকন্যা ময়নামতীর সেইদিন রাত্রিকালে দক্ষিণ দেশের রাজপুত্রের সাথে বিয়ে হবে। শুনে তার মুখ শুকিয়ে গেল, কিন্তু সে ভাটা গোয়ালানীকে সে জানতে দিলে না। হেসে বলে, “তাই নাকি, তা বেশ, বেশ, আমরা গরীব লােক, দুদিন খেয়ে বাঁচবাে।”

তারপর গোয়ালানীর কাছে থেকে দুধসুদ্ধ ভাড়টা কিনে। নিয়ে একটা ঝোপের মধ্যে গিয়ে কাপড়চোপড় বদলিয়ে নিজে গোয়ালানী সেজে দুধের ভাড় মাথায় করে রাজার বাড়িতে দুধ বিক্রী করতে গেল । মহলে ঢুকে ভড়টা একদিকে নামিয়ে রেখে সে দাসীর কাছে খবর নিয়ে যে ঘরে রাজকন্যা ছিলাে- তাড়াতাড়ি সেই ঘরে এসে হাজির হলাে। রাজকন্যাকে দেখবামাত্রই সে চিনতে পারুলে, ঠিক একেই তাে সে স্বপনে দেখেছিল।

রাজকন্যাকে এককোণে ডেকে নিয়ে সে নিজের পরিচয় দিলেআরও কত স কথা বলে। রাজকন্যাও যেন নিজের প্রাণের কথা এতদিন পরে তার কাছে বল্‌তে পেরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলে ।

তারপর তাকে বিদায় দেবার সময় সে বলে, “একপ্রহর রাতে। তুমি নদীর ঘাটে কাঙালী জেলের রূপাের নৌকা আর সােনার বৈঠা নিয়ে বসে থেকো। আমি তােমার কাছে যেমন করে হােক যাবাে তারপর দু’জনে এ রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যাবাে।”

রূপাের নৌকো আর সােনার বৈঠার এমন গুণ যে, যে দেশে যে মানুষ যেতে চায়, সে দেশের কথা মনে করলে আর বৈঠা বাইতে । হয় না। নৌকো সেখানে আপনা আপনি যায়। রাজপুত্র মােহনলাল রাজার বাড়ি থেকে বাইরে এসে গোয়ালানীর পােশাক ছেড়ে নিজের পোশাক পরলে। তারপর তার ভাবনা হলাে, সে কাঙালী জেলের। কাপার নৌকো আর সােনার বৈঠা কি করে পাবে। হঠাৎ তার মনে যে বাঘমামা তাে তাকে বলেছিলাে, বিপদে আপদে তাকে ডাকতে। কথাটা যেই মনে পড়া, অমনি সে হাঁটু পেতে বসে চোখ। বজে এক মনে ‘বাঘমামা বাঘমামা বলে ডাকতে লাগলাে। আর দেখতে না দেখতে বন-বাদাড় ভেঙে ‘হালুম’ ‘হালুম’ করতে করতে বাঘমাতা তাে তার ছেলেপুলে সব নিয়ে এসে হাজির। বললে, “ভাগ্নে, ব্যাপার কি? কি বিপদ তােমার?”

রাজপুত্র বলে, “মামা, রূপাের নৌকা আর সােনার বৈঠা। কাঙালী জেলের ঘরে আছে- সেটা আমার দরকার।”

আর যায় কোথা,- 'হালুম হালুম’ করতে করতে বাঘ তাে। সদলবলে গিয়ে পড়লাে জেলের বাড়ি। আচমকা এমন বিপদ দেখে তারা ভয়ে তড়াসে কেঁপেই অস্থির । বাঘ বললে, “তােমার রূপাের নৌকা আর সােনার বৈঠা শীগগির বের করে দাও, নইলে সবাইকে আমরা খেয়ে ফেলবাে। | তারা আর কি করে, জিনিষের চেয়ে প্রাণের মায়াই ঢের বেশি। ভয়ে ভয়ে রূপাের নৌকা আর সােনার বৈঠাটা তারা বের করে দিলে।

বাঘ সেটা নিয়ে রাজপুত্রকে দিয়ে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজের দেশে ফিরে গেল।

নিঝুম রাত। জ্যোৎস্নায় যেন যুঁইফুল ঝরছে। নদীর ডাক তার সাথে মিশে চারদিক মাতিয়ে তুলেছে। নৌকার ওপরে বসে। রাজপুত্রের আর সময় কাটতে চায় না। এক প্রহর গেল, দুই প্রহর যায় যায়- তবু রাজকুমারী এলাে না দেখে তারা মনটা যেন কেমন। কেমন করতে লাগলাে। ভাবলে, কি বা পিবদ হয়েছে। নৌকাটা। বেশ করে বেঁধে রেখে ময়নামতির খোজ নিতে সে রাজবাড়িতে। চলে গেল ।

এদিকে সেই কাঙালী জেলের মনে সুখ নেই। তার অত সাধের । অমন রূপের নৌকাখানা আর সােনার বৈঠাটা হাতছাড়া হয়েছে, সে কি আর স্থির থাকতে পারে! যে ঘাটে ঐ নৌকাটা বাধা ছিলাে সে। তারই কিছু দূরে ঝােপের মধ্যে ঢুকে মনে মনে ফন্দি আঁটতে বসেছিলাে। রাজপুত্রকে নৌকো থেকে নেমে যেতে দেখে সে। ভাবলে,- এইতাে সুযােগ। সে দুই লাফে এসে নৌকোয় উঠে বসে তার বাঁধন যেই খুলে দিতে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে রাজকুমারী ময়নামতী এসে তাড়াতাড়ি নৌকোয় উঠে বসলে । এদিকে নৌকা স্রোতের মুখে আগা পেয়ে তরতর করে ছুটে যেতে লাগলাে। | ময়নামতী কাঙালী জেলেকে তাড়াতাড়িতে লক্ষ্য করেনি! তারপর ধীরে সুস্থে তার কাছে গিয়ে তার মুখের দিকে চেয়েই চমকে উঠলাে। বললাে, “তুমি কে?”

কাঙালী বলে, “আমার নাম কাঙালী- তােমাকে আমি বিয়ে করবাে।” অন্য সময় হলে রাজকুমারী তার এই বেয়াদবীর জন্যে তার মুখে হয়তাে জুতাে মারতো, কিন্তু অকূল দরিয়ায় চারদিকে চেয়ে তার সে সাহস হলাে না। মনের দুঃখ মনে চেপে রেখে বললে, “বেশ, এ আর হবে না কেন! তবে দেখ, ছমাস আমার একটা ব্রত আছে। এই সময়টা তােমার সাথে আমার বাপ আর মেয়ের সম্বন্ধ। ছ'মাস পরে যদি বিয়ে করতে চাও- আমি রাজি আছি।”

কাঙালি বেচারী আর কি করে, ভাবল রাজকুমারীকে বেশি ঘাটাঘাটি করলে শেষে হিতে বিপরীত হতে পারে। সে অগত্যা তাতেই স্বীকৃত হয়ে নিজের বাড়িতে এনে তাকে লুকিয়ে রাখলাে।

 

পাঁচ 

ওদিকে রাজপুত্র রাজবাড়িতে গিয়ে শুনতে পেলে রাজকুমারী  ময়নামতীকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার মনটা খুশিতে ভরে উঠলাে, সে নিশ্চয়ই এতক্ষণ নৌকাতে গিয়ে তার জন্যে অপেক্ষা করছে। সে তাড়াতাড়ি নদীর ঘাটে এসে হাজির। কিন্তু তার নৌকোই বা কোথায়, আর ময়নামতীই বা কোথায়!!

রাজপুত্র পাগলের মতন হয়ে নদীর কূলে কূলে ছুটাছুটি করে। বেড়াতে লাগল- ততক্ষণ হয় তাে সােতের টানে ময়নামতী আর জেলেকে নিয়ে রূপাে নৌকা এক রাজার দেশ ছেড়ে আর এক রাজার দেশে হাজির হয়েছে। চারদিকে খুঁজে খুঁজে যখন কিছুতেই ময়নামতীকে পাওয়া গেল না, তখন হতাশ হয়ে নদীর কিনারে বসে রাজপুত্র মাথায় হাত দিয়ে হায় হায় করতে লাগল ।

সাত সমুদ্র তেরাে নদীর ওপারে যে দৈত্যপুরী আছে। সেই পর রাজার মৃত্যু হয়েছে। রাজ্যে হাহাকার, দোকান পাঠ বন্ধ । পথে লোক চলে না, কাক চিলেরা উড়ে না। রাজার শােকে সবাই পাগল। রাজার ছেলে সন্তান নেই সেই জন্যে সিংহাসন খালিআর বন্ধ। দৈত্যপুরী থেকে সিপাই শাস্ত্রী ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সুলক্ষণযুক্ত কোন ছেলে পাওয়া গেলেই তাকে ধরে নিয়ে এসে শূণ্য সিংহাসনে বসিয়ে দেয়া হবে। দেশের সিপাই, শাস্ত্রী, পাইক, বরকন্দাজেরা একেবারে হয়রাণ হয়ে উঠেছে। তেমন রাজপুত্র আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বিরক্ত হয়ে একদম তারা আশাই ছেড়ে দিলে । অবশেষে সেই নদীর ধারে এসে রাজকুমাকে দেখেই তাদের আর আনন্দ ধরে না। যেমনটি তারা খুঁজুছিলাে ঠিক তেমনটিই মিলে গিয়েছে। তারা সকলে মিলে তাকে ধরাধরি করে নিজেদের রাজ্যে এনে তাকে শুন্য সিংহাসনে বসিয়ে রাজা করলে।

রাজপুত্র মােহনলাল দৈত্যদের দেশের রাজা হলেও মনে সুখ  পেলাে না। সব সময়েই তার শুধু ময়নামতীর চিন্তা। ময়নামতীর অভাব তার কাছে পৃথিবীটাই মিথ্যা। নিজের মনের দুঃখ মনে চেপে তার দিন কাটে।

দেত্যদের দেশে হাজার রকমের আমােদ আহ্লাদ, হরেক । মকমের আজব তামাসা । সেই দেশের মন্ত্রী, পাত্র, মিত্রেরা গােপনে গােপনে লক্ষ্য করলেন যে, এসবে কিছুতেই রাজার মন নেই এখানে এসে পর্যন্ত তিনি একদিনও হাসেননি। এর কারণ কি! কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারলে না। একদিন তারা পরস্পর একসঙ্গে মজার কাছে এসে প্রণাম জানিয়ে, তার মনের দুঃখের কারণ জানতে চাইলো।

 রাজপুত্র তখন নিজের মনের সব কথা তাদের কাছে খুলে বললে। আরাে বলল যে, সেই রাজকুমারী ময়নামতীকে যে নিয়ে গেছে তার কিছুই সে জানে না। কিন্তু তাকে না পাওয়া পর্যন্ত তার মনে আর শান্তি নেই।।

সব শুনে উজির নাজিরেরা তক্ষুণি এর একটা উপায় করবার। খোঁজ- রাজ্যিময় একটা সােরগােল পড়ে গেল। কোথায় বা সে। ময়নামতী- কোথায় বা সে রূপাের নৌকো আর সােনার বৈঠা । 

দিনের মধ্যে রাজকুমারীকে খুঁজে না পাওয়া গেলে তাদের সবাই ছেলেপুলে শুদ্ধ গর্দান যাবে- কোটালের হুকুম। | এদিকে ছ'মাস পূর্ণ হতে আর মাত্র একটা দিন বাকি। কাঙালী ভাবছে আর একটা দিন পরেই রাজকুমারীর সাথে তার বিয়ে হবে। মন তার আনন্দে ভরে উঠেছে সত্যি সত্যি।

ময়নামতীর মনে দিনরাত চিতার আগুন। বেচারী চান করে না- খায় না- রাজপুত্র ভাবনায় শুকিয়ে আধমরা হয়েছে। আর তাে একদিন মাত্র। তারপর এ মূর্খ জেলে তাকে বিয়ে করবে। হায়রে কপাল!! কিন্তু তা হবে না-

ভাবল, আজ রাত ভাের হলেই সে বিষ খেয়ে নিজের প্রান নিজে। দেবে, তবু একজন জেলের ঘরের বউ হতে সে কিছুতেই পারবে না।

ঠিক এমনি সময়ে দৈত্যদেশের সিপাই শাস্ত্রীরা ময়নামতিকে খুঁজতে খুঁজেতে জেলের ঘরে এসে হাজির। তারা অনেক খোজ খবর নিয়ে জানতে পেরেছিলাে যে এইখানেই ময়নামতীকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

তারা দরজায় গিয়ে হাঁক দিলে, “হেঁইও জেলে,- কৃষ্ণপুরের রাজকন্যা তােমার ঘরে আছে?”

জেলে রেগে খুন চটেমটে বাইরে এসে তাদের সবাইকে লাঠি নিয়ে তাড়া করলে । আর যায় কোথা! সিপাইশাস্ত্রীরা তার লাঠিটা কেড়ে নিয়ে তাকে পিঠমােড়া করে বেঁধে আচ্ছা ঘা কতক দিয়ে দিলে । তারা তারপর রাজকন্যা, রূপাের নৌকো, সােনার বৈঠা আর কাঙালী জেলেকে নিয়ে দৈত্যপুরীতে ফিরে এল। 

ময়নামতীকে ফিরে পেয়ে রাজপুত্র মােহন লাল আনন্দে প্রায় বেহুস হয়ে পড়লাে । রাজকুমারীর অবস্থাও অনেকটা সেই রকম। কাঙালী জেলেকে তার বেয়াদপী আর অপরাধের জন্যে চিরজীবন কারাগারে আটক রাখা হলাে।

কিছুদিন যায় তারপর একদিন দৈত্যপুরীর সবাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রাজকুমার আর রাজকুমারী রূপাের নৌকোয় উঠে নিজের দেশে ফিরে চলাে।

ঝম ঝম ঝম্ রূপাের নৌকো সাত সমুদ্র আর তেরাে নদীর। পথে ছুটে চলেছে রাজপুত্র মােহনলাল আর কন্যা ময়নামতীকে নিয়ে।

মাত্র অর্ধেক পথ গিয়েছে কি যায় নি- এমনি সময় আওয়াজ উঠলাে- রূপাের নৌকো আর সােনার বৈঠা নিয়ে কে পালায়নৌকো বাঁধাে থামাও নৌকা- নইলে... নইলে কি কি কথা আর শেষ হতে পেলাে না।

এ দিকে ব্যাপার হয়েছে কি- কাঙালী জেলেকে দৈত্য রাজার লােকেরা ধরে নিয়ে যাবার পর থেকেই তার লােকজনেরা তাকে খুঁজে খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে উদ্ধার করে আনবার জন্যে। কারণ কাঙালী ছিল জেলেদের দলের সর্দার।  কিন্তু খোজ পায় নি। এবার নদীতে রূপাের নৌকো দেখে তারা ঐ ভাবলে- বােধহয় দৈত্য রাজার লােকেরা এই নৌকোতেই কাঙালী জেলেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে! তাই হাঁক দিলে নৌকো থামাবার জন্যে।

ডাক শুনে রাজপুত্র ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। এসে দেখেন নদীর পাড়ে বহু লােকের জনতা। এর মধ্যে কয়েকজন একটা নৌকোতে উঠতে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য তারা  নৌকোতে করে এসে তাদের নৌকোকে আটকাবে। রাজপুত্র দেখলে বিপদ- সে তখনই স্মরণ করলে- বাঘ

মামাকে।

 আর যায় কোথায়! অমনি বাঘমামা দলবলে এসে নদীর পাড়ে হাজির! বাঘের দল দেখে সবাই ছুটোছুটি করে পালাতে লাগলাে আর যারা নৌকোতে উঠতে যাচ্ছিল তারা ভয়ে নদীর মধ্যে লাফিয়ে পড়ে ডুবে গেলাে।

এদিকে রাজপুত্র সেই রাজ্য ছাড়িয়ে অন্য রাজ্যে এসেছে। এখন বেশ শান্তিতে তারা পথ চলতে চলতে দেশে এসে পৌঁছলেন।

রাজপুত্র মােহনলালকে হারিয়ে বুড়াে রাজা আর রাণী মনের দুঃখে দিন কাটাচ্ছিলেন। এত দিন পরে তাকে ফিরে পেয়ে তাদের আর খুশি ধরে না। তারা কাঁদতে কাঁদতে তাকে আর ময়নামতীকে বুকে জড়িয়ে ধরুলেন।

তারপর- রাজপুত্রের সাথে ময়নামতীর বিয়ে । সাতদিন সাতরাত্তির আমােদ আহ্লাদ, মিঠাইমণ্ডার ছড়াছড়ি- লুচির পাড়াক্ষীরের দীঘি- দধির পুকুর- নাচ-গাচের বাদ্যিভাণ্ডের তুফান।

বাঘমামা আর বাঘমামী, আর তাদের ছেলেপুলেরা এসে তাজা ছাগল ভেড়া খেয়ে ভাগ্নে আর ভাগ্নে বউকে আশীর্বাদ করে বনে  ফিরে গেলাে।

রাজপুত্র মােহনলাল তখন রাজা হয়ে ময়নামতীকে নিয়ে মনের সুখে রাজত্ব করতে লাগলেন।

0 Comments Here
Authentication required

You must log in to post a comment.

Log in
Related Post
StorialTechঅবনির চোখে জল
অবনির চোখে জল

দুঃখ আর হতাশা একটা ছেলের জন্য যতটুকু সহনীয় মেয়েদের জন্য নাকি তা আরও বেশি সহনীয়।কিন্তু,এই কষ্ট..


StorialTechবউ + যৌতুক
বউ + যৌতুক

আজ আমার সবচাইতে খুশির দিন।যেন মনে হচ্ছে আমাদের সেই স্কুল লাইফের আবুল স্যারের বাই সাইকেলের টায়ার..


ভালোবাসার মিস্টি..
ভালোবাসার মিস্টি গল্প

-- ইয়াক এটা কি পরেছিস? শয়তানের মত দেখাচ্ছে একদম
-- মানে? কি সমস্যা? ঠিকি তো..