নিছক এখটু ভয় দেখানো

নিছক এখটু ভয় দেখানো

ব্যাঙ্গালোর থেকে কলকাতার ফ্লাইটে উঠেই শান্তনু টের পেল ফ্লাইটটা বেশ ফাঁকা। সামান্য কিছু যাত্রী ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। হয়তো বেশি রাতে কলকাতা পৌঁছোচ্ছে বলেই লোক কম।
শান্তনুর নিজের সিটটা প্লেনের মাঝামাঝি। আইল সিট–অথাৎ প্যাসেজের ঠিক পাশে। সিটের দিকে এগোতেই শান্তনু দেখতে পেল ওই রো-তেই ওর পরের সিটটা ছেড়ে জানলার ধারের সিটে এক ভদ্রলোক বসে আছেন,
জানলার দিকে মুখ করে। শান্তনুর বসার সময় একবার মুখ ঘুরিয়ে তাকালেন। বয়স পঞ্চাশের ওপরে। বেজায় মোটা, প্রায় সারা মাথা জোড়া টাক। গোল গোল চোখের ওপর একটা পুরোনো স্টাইলের ভারী চশমা।
গায়ে ঢোলা চেক-চেক হাফহাতা জামা। মুখটা দেখে মনে হল ভদ্রলোক বেজায় টেনশনে আছেন। প্লেন সময়মতোই ছাড়ল। শান্তনুর চোখের সামনে খবরের কাগজ খোলা থাকলেও টের পেল যে পাশের ভদ্রলোক
 বারবার সিট বেল্টটা টেনেটেনে দেখছেন। আগে বোধহয় কখনও ফ্লাইটে চড়েননি। বিমান সেবিকার... ইন দ্য আনলাইকলি ইভেন্ট অফ ওয়াটার ল্যান্ডিং... ঘোষণাটা শুনে যেভাবে বারবার সিটের তলায় হাত দিয়ে লাইফ
 জ্যাকেটটা দেখছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল পারলে এখনই লাইফ জ্যাকেটটা খুলে গায়ে পরে নেন। প্লেনটা যখন রানওয়েতে ছুটতে শুরু করল ভদ্রলোক দু-হাতে সিটের হাতল দুটো আঁকড়ে ধরলেন। মুঠো তখনই আলগা হল,
 যখন প্লেন মধ্যগগনে। সিটবেল্ট সাইন চলে গেছে। ভদ্রলোক তবু ওনার বিশাল দেহটাকে বেল্ট দিয়েই বেঁধে রাখলেন।

শান্তনু চিরকালই মজা করতে ভালোবাসে। যখন কলেজে পড়ত তখন নানাধরনের নতুন নতুন র‍্যার্গিং-এর উপায় ভেবে বার করত। এখনও মজা করার সুযোগ পেলে ছাড়ে না। ইচ্ছে হল পাশের লোকটাকে নিয়ে একটু মজা করা যাক।
—আপনি কি ব্যাঙ্গালোরে থাকেন? লোকটা চমকে উঠে ঘাড় ঘোরাল,
—আমাকে বলছেন? —হ্যা, বলছিলাম—ব্যাঙ্গালোরে কি বেড়াতে এসেছিলেন?
—হ্যা, তা বলতে পারেন,-বেড়ানোই বটে। আজব লোক তো! সরাসরি উত্তর দেয় না। শান্তনু ফের বলে উঠল,
—তা আপনি প্লেনে উঠতে একটু ভয় পান দেখছি, প্রথমবার? লোকটা একটু অপ্রস্তুতের হাসি হাসল। বিজ্ঞের হাসি হেসে শান্তনু বলে উঠল,আমি রেগুলার যাই। কে প্রথমবার উঠে ভয় পাচ্ছে তা দেখলেই বুঝতে পারি।
—আপনার ভয় লাগে না? কতই তো অ্যাক্সিডেন্ট হয়! ভদ্রলোক বললেন।
প্রথম দু-একবার ভয় লাগত। এখন অভ্যেস হয়ে গেছে। তবে এই তো জীবন। আজ আছি, কাল নেই। ভয় করে লাভ কী? | মোটা লোকটা মাথা নেড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল,—ঠিকই বলেছেন।
—আর চিন্তা করে হবেই বা কী! ধরুন প্লেনের টায়ারটা ল্যান্ড করতে গিয়ে বাস্ট করল। ব্যস, কয়েক সেকেন্ডে শেষ। কিছু করার আছে?
লোকটা গোল গোল চোখ করে সায় দিল। শান্তনু বুঝল ওষুধ ধরেছে। ফের বলে উঠল,
—তবু চিন্তা হয়। আপনারও হবে জানি। এই তো কলকাতার অবস্থা! ল্যান্ডিং করবে—তার জন্য এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারকে এতগুলো প্লেনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়, কে কোন উচ্চতায় থাকবে।
একটু ভুলচুক হলেই... পাশের লোকটা চুকচুক করে একটা দুঃখসূচক আওয়াজ করে উঠল।

—ঠিকই, আজকাল যা অবস্থা! শান্তনু আবার বলল,—হয়তো ঘুমিয়ে পড়ল। বেশিক্ষণ না হলেও হবে। মিনিট দু-তিন হলেই হল, এর ওর সঙ্গে ধাক্কা। কত যে অ্যাক্সিডেন্ট হবে, তাই না?
—ঘুমিয়ে পড়বে?
—কেন ঘুমোবে না বলুন? ওরাও তো মানুষ! তা ছাড়া এরাও তো বেশির ভাগই সবে প্লেন চালাতে শিখেছে। সব ট্রেনি। এখনও অর্ধেক যন্ত্রের ব্যবহার জানে না।
-বলেন কী?
নয়তো কী! এই তো, আমার এক বন্ধুর ভাই কো-পাইলট। এখনও পাইলট হওয়ার পরীক্ষা পাশ করেনি। নিয়মমাফিক ও চালাতে পারে না। কিন্তু কে দেখতে যাচ্ছে বলুন?
—সে কী? তবে ওদের সঙ্গে অভিজ্ঞ পাইলটও তত থাকে, তাই ? —হাঃ হাঃ শান্তনু হেসে বলে ওঠে,—বেশি অভিজ্ঞ আর মিস্টার আগরওয়াল গত পয়ত্রিশ বছর এয়ার ইন্ডিয়ার পাইলট। আমার সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলেন।
শাটলই দেখতে পান না। চোখে ছানি। দুদিন শাটল ভেবে আমার মাথায় মেরেছেন। রিটায়ার করেছিলেন। আবার চালাতে হচ্ছে—পাইলট নেই। প্লেনগুলো বসে যাবে।
নাহ, এ তো ভারী চিন্তার কথা! ভদ্রলোক প্রায় সোজা হয়ে বসেছেন। ভুঁড়িটা সিটবেল্টের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছে, হুঁশ নেই।
—আর এসব প্লেনের মেনটেনান্স? জানেন সে কথা? শান্তনু একটু বিজ্ঞের হাসি হেসে বলল, আজ প্লেনে ওঠার সময় আলিকে দেখলাম। প্লেনের ইঞ্জিনগুলো চেক করছিল।
—তাও ভালো! যাক্, ইঞ্জিনটা তো চেক করেছে।

--ধুর! ওই আলিকে আমি গত পনেরো বছর ধরে চিনি।। আমার বাড়ির কাছে একটা গাড়ির গ্যারেজের মেকানিক ছিল। সেখানে একবার গেলে বার বার যেতে হবে।
—খুব ভাললা সার্ভিস বুঝি! --আরে না-না। ধরুন, আপনার গাড়ির এসিটা কাজ করছে না। গেলেন—এসি কোনওমতে চলল—কিন্তু দুদিন বাদে গাড়ি আবার থামল। কী ? না—স্টার্টার খারাপ। ওটা ঠিক করলেন তো দুদিন যেতে না যেতে ইঞ্জিন খারাপ বুঝুন,
কীরকম মেকানিক! তাও তো সেটা অ্যামবাসাডর গাড়ি ছিল। ও জেট ইঞ্জিনের কী বুঝবে বলুন! ভদ্রলোক এয়ার হোস্টেসকে ডেকে একটু জল নিলেন। শান্তনু আশ্বস্ত করল,-তবে সবই ভাগ্য। সবসময় যে প্লেন আক্সিডেন্ট হবেই এ কথা বলা যায় না।
হয়তো সেজন্যই আমরা আজ কলকাতা পৌঁছোব। ভদ্রলোক জলটা শেষ করে বলে উঠলেন,—ঠিকই, সবই ভাগ্য আমি আবার যখনই যেখানে উঠেছি, সেটাতেই অ্যাক্সিডেন্ট। বাসে করে দীঘা যাচ্ছিলাম—বাস আর ট্রাকে মুখোমুখি ধাক্কা হাতের হাড় ভাঙল।
প্রাণে বাঁচলাম। ট্রেনে পুরী যাচ্ছি—বেলাইন হয়ে চারটে বগি ছিটকে বাইরে পড়ল। জানলা ভেঙে আমাকে বার করা হল। কোনও মতে বাঁচলাম। দু-বছর আগে প্লেনে প্রথম চড়লাম। সেই আবার অ্যাক্সিডেন্ট। শুনেছিলাম পাখি ঢুকে ইঞ্জিন বিকল করে দিয়েছিল,
শান্তনু এতটা আশা করেনি। ভদ্রলোকের ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। এরকম ভয়াবহ যার অভিজ্ঞতা। একবার ঢোঁক গিলে ও বলে উঠল,বেঁচেছেন, এটাই যথেষ্ট। প্লেন অ্যাক্সিডেন্টে কজন বাঁচে বলুন?
ভদ্রলোক এই প্রথমবার বিগলিত ভাবে হাসলেন,—বেঁচেছি কে বলল? কেউই বাঁচেনি, তবে প্লেনে চড়ার শখটা যায়নি বলে না অপূর্ণ ইচ্ছা! যখনই কোনও প্লেনের ইঞ্জিন খারাপ হবে জানি, চড়ে বসি।
কথাটা শেষ হতে না হতে শান্তনু হঠাৎ খেয়াল করল—বাইরে যেন কীসের একটা প্রচণ্ড আওয়াজ। হঠাৎ করে প্লেনের ভিতরের আলোগুলো কেঁপে উঠে নিভে গেল। একটা অ্যানাউন্সমেন্ট হলফাস্ ইওর সিটবেল্ট... অ্যানাউন্সমেন্টটা শেষ হল না।
চারদিকের আর্ত চিৎকারের মধ্যে শান্তনু বুঝতে পারল প্লেনটা প্রচণ্ড গতিতে নীচের দিকে নামছে। জ্ঞান হারানোর আগে দেখল জানলার ধারের সিটে বসা লোকটা তখনও হেসে যাচ্ছে।

লেখকঃ অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী

0 Comments Here
Authentication required

You must log in to post a comment.

Log in
Related Post
ব্রেক আপ..
ব্রেক আপ বাহ্যিক জগতে সম্ভব,অভ্যন্তরীণ জগতে নয়!

নীরা কল দিয়েছে।এই মেয়েটা ব্রেক আপ এর পরেও ৩বছর ধরে কল দিচ্ছে।এই মেয়ে কী বোঝেনা ব্রেক..


রাজপুত্রের বিয়ে
রাজপুত্রের বিয়ে

আজ অগ্নিদ্বীপের রাজপুত্রের বিয়ে। সমস্ত রাজ্যে তাই উৎসব, এমন সমারােহ কেউ কোনােদিন দেখেনি।

পাত্রী মরকতপুরের রাজকন্যা..


ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী
ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী

দুধের মতাে সাদা ধবধবে তেজী ঘােড়া ছুটিয়ে এক তেজী। জোয়ান রাজপুত্র মস্তো বড় এক তেপান্তর মাঠ..