গল্প: ঘটনার ঘনঘটা

  • Share this:

থানার ওয়েটিং রুমে বসে আছি প্রায় এক ঘণ্টা হলো। রুমে আমার সাথে আরও তিনজন মানুষ রয়েছে। এমন সময় পাশের সিটে বসে থাকা ব্যক্তিটি আমাকে ডাকলেন।

‘ভাইয়ের বাসা কী সদরেই?’

‘জি ভাই।’

‘ও আচ্ছা। আমগো বাসা ম্যালা দূরে। এক কেসের কারণে আমাগো তিনজনরে থানায় ডাইকা আনা হইছে। আপনের কী কেস?’

‘অনেক লম্বা কাহিনী ভাই।’

‘ছোট কইরা বলেন নাহয়। বসেই তো আছি। শুনতাম একটু।’

‘আচ্ছা ঠিক আছে।’

আমি লম্বা কাহিনী ছোট করে বলার প্রস্তুতি নিচ্ছি। লোকটা বাকি দুজনকে কাছে ডাকলেন। আমাকে ঘিরে বসলেন তিনজনে। আমি গলা খাকারি দিয়ে চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করলাম।

‘ঘটনার সূত্রপাত আজ থেকে কয়েক বছর পূর্বে। একদিন রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, পথিমধ্যে হঠাৎ দশ টাকার একটি নোট কুড়িয়ে পাই। নোটের উপর লেখা- এই টাকা ঘুরিয়ে দেবে ভাগ্যের চাকা।’ এতটুকু বলে থামলাম। খেয়াল করে দেখি তিনজনই ভীষণ কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে আমার দিকে।

‘তারপর? আপনের ভাগ্যের চাকা ঘুরছিল?’

‘তাই হয় নাকি! আমি ওসবে বিশ্বাস করি না। ভাবলাম টাকাটা কোন এক ভিক্ষুককে দিয়ে দিবো। কিন্তু সারাদিন পার হয়ে গেলেও কোন ভিক্ষুকের দেখা পেলাম না। তবে এমন সময় লটারির ভ্যানগাড়ি দেখতে পেলাম। এরপর কী মনে করে যেন সেই দশ টাকা দিয়ে একটি লটারি কিনলাম। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, লটারিতে প্রথম পুরস্কার পেয়ে যাই আমি। ৫০ লক্ষ টাকা!’

‘খাইছে রে! ৫০ লক্ষ টাকা! তারপর? কী করলেন সেই টাকা দিয়ে?’

‘কিছু করার সুযোগ পেলাম কোথায়! লটারির আয়োজকরা অনুষ্ঠান করে হাতে টাকা তুলে দিলো। ৫০ লক্ষ, অর্থাৎ অর্ধকোটি টাকা। সেই টাকা নিয়ে সিএনজিতে চড়ে বাসায় ফিরছিলাম, মাঝ রাস্তায় ছিনতাইকারীর খপ্পড়ে পড়লাম। তখন রাত প্রায়। অন্ধকার এক গলিতে গিয়ে সিএনজি দাঁড়িয়ে পড়লো। কয়েকজন লোক এসে টাকা ভর্তি ব্যাগ, মোবাইল, কাপড়-চোপড় সব নিয়ে নিলো জোর করে। যাবার আগে চোখে মলম লাগিয়ে দিলো। আমি আর কিছু দেখতে পারলাম না।’

‘হায়হায়! এইডা কোন কথা! এ দেখি বিশাল সর্বনাশ। তারপর কী হইলো?’

‘এরপর চোখ খুলেই দেখি হুরপরীর মতো সুন্দরী এক নারী। আমি তখন হাসপাতালে। দুর্ঘটনার দুদিন পর চোখ খুলেছিলাম। চোখ খুলেই সুন্দরী সেই নারীকে দেখতে পাই। পরে জানতে পারি সে হাসপাতালের নার্স, নাম সুমাইয়া। আমি রীতিমতো প্রথম দেখাতেই তার প্রেমে পড়ে যাই। হাসপাতালে এক সপ্তাহের মতো থাকতে হয়েছিল। এই এক সপ্তাহেই আমাদের প্রেম জমে ক্ষীর। সিদ্ধান্ত নেই, বিয়ে করলে সুমাইয়াকেই করবো।’

‘মাশাল্লাহ! ভাইরে দেইখেই বোঝা যায়, বেশ রোমান্টিক মানুষ আপনে। তারপর কী হইলো?’

‘প্রেমের বয়স যখন ৬৯ দিন মাত্র, তখন সুমাইয়ার বাসায় সব জানাজানি হয়ে যায়। ওর পরিবারের প্রভাব-প্রতিপত্তি অনেক। বাবা আর্মি অফিসার, বড় ভাই র‌্যাব কর্মকর্তা, মেজো ভাই পুলিশ কর্মকর্তা, ছোটভাই এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী। তারা কোনভাবেই আমাদের প্রেমের সম্পর্ক মেনে নেবে না। এরপর থেকে দিন নেই রাত নেই, একের পর এক মৃত্যু হুমকি আসতে থাকে আমার নামে।’

‘কী একটা ভয়াবহ অবস্থা! তারপর কী হইলো ভাই?’

‘হুমকি-ধামকিতেও অনড় রইলাম আমি। মরতে রাজি, কিন্তু সুমাইয়াকে হারাতে রাজি না। কিন্তু বিধিবাম, আমার বিরুদ্ধে হালি খানেক মামলা করা হলো। ডজন খানেক সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা হলো। পুলিশে এসে গ্রেফতার করলো, আদালতে মামলা উঠলো। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দন্ডিত হলাম আমি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জেলখানায় কয়েদী হিসেবে বছর খানেক সময় পার হয়ে গেল।’

‘বলেন কী! যাবজ্জীবন সাঁজা! অথচ আপনে তো এখন জেলখানার বাইরে! কীভাবে কী হইলো?’

‘জেলখানায় থাকাবস্থায় এক গডফাদারের সাথে সখ্যতা তৈরি হয়। আমি খুব ভালো তেল দিতে পারি। মানে, ভালো তেল মালিশ করতে পারি। জেলখানায় সার্বিক ঝামেলা এড়াতে গডফাদারকে নিয়মিত তেল মালিশ দিতাম, সেবাযত্ন করতাম। খুশি হয়ে তিনি আমাকে মাফিয়াতে যোগদানের অফার দেন। ভেবে দেখলাম, সারাজীবন জেলখানায় পঁচে মরার চাইতে মাফিয়া ডন হয়ে পঁচে মরা ভালো। আমি লুফে নিলাম অফারটা। এরপর দীর্ঘ এক মাসের পরিকল্পনায় দলবদ্ধভাবে মাটি খুঁড়ে জেল পালাই আমি।’

‘কী শুনাইলেন ভাই! শুনে শরীরের পশম খাঁড়ায়া গেল। তারপর?’

‘জেল থেকে পালিয়ে মাফিয়াগিরিতে মনোযোগ দিলাম। এ লাইনে আমি একদমই নতুন। সবকিছু শিখতে, কায়দা কানুন রপ্ত করতেই বছর পেরিয়ে গেল। আমার মেধা-বুদ্ধি ভালো হওয়ায় বেশি কষ্ট করা লাগলো না। খুব দ্রুতই শহরের নাম্বার ওয়ান মাফিয়া ডন হিসেবে নামডাক কুড়ালাম। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, শহরের ত্রাসে পরিণত হলাম। যখন দেখলাম আমার নাম শুনে ভয়ে সবাই প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলতেছে, তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম- সুমাইয়াকে আমার চাই। এরপর যেই ভাবা সেই কাজ। আমি গিয়ে সুমাইয়াকে তুলে নিয়ে আসলাম।’

‘সেরাহ্! এইডা একটা কামের কাম করছেন ভাই। তারপর কী হইলো?’

‘সুমাইয়াকে তুলে আনার পর জানতে পারলাম ওর বিয়ে হয়ে গেছে। জামাই বিসিএস ক্যাডার। সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা। এরপর রাতারাতি আমার জীবন পাল্টে গেল। বড় বড় জায়গা থেকে চাপ আসতে লাগলো। দেখলাম মহা বিপদ অপেক্ষা করছে। আমার মাফিয়া গ্যাংকে রীতিমতো তুলোধুনা করা হলো। প্রতিটা সদস্যকে গ্রেফতার করে হাজতে ভরা হলো। বুঝলাম, পালিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। আমি দালাল ধরলাম। যেভাবেই হোক দেশত্যাগ করতে হবে।’

‘কী কান্ড! তারপর?’

‘দালালের মাধ্যমে সমুদ্র বন্দরে পৌঁছালাম। নৌপথে দেশ ছাড়তে হবে। রাতে দুধকলা সমেত ভাত দেওয়া হলো। পেটভরে খেলাম। খাওয়ার পরপরই ঘুম। যখন ঘুম ভাঙলো, নিজেকে হাসপাতালে আবিষ্কার করেছি। জানতে পারি, নিজের একটা কিডনি বের করে নেওয়া হয়েছে। কে বা কারা নিয়েছে বলতে পারি না। কিন্তু এই কাজের সাথে যে ওই দালাল জড়িত, তা আমি শতভাগ সিওর।’

‘ইন্না লিল্লাহ! তারপর কী হইলো ভাই?’

‘আর তারপর! নিখোঁজকৃত কিডনির সন্ধানেই থানায় এসেছি। ভাবলাম জিডি করে রাখি। যদি কোনভাবে পেয়ে যাই কিডনিটা, মন্দ কী!’

এই পর্যায়ে তিনজনই হাঁফ ছাড়লো! একজনের চেহারা রীতিমতো টকটকে লাল হয়ে আছে। যেন দম আটকে রেখেছিল এতক্ষণ। তবে এই মুহূর্তে সবার চেহারায় স্বস্তি বিরাজ করছে। পাশে বসা ব্যক্তিটি হাসিমুখ করে এগিয়ে আসলো।

‘টেনশন নিয়েন না ভাই। আমার বিশ্বাস, আপনে নিজের কিডনিটা খুঁইজা পাইবেন। আইনের হাত অনেক লম্বা। ঠিকই আপনের কিডনি হাতায়া পাইবো।’

‘অসংখ্য ধন্যবাদ ভাই। দোয়া করবেন।’

‘সেইটা তো অবশ্যই। তা ভাই এখন কী করেন?’

‘আমি বর্তমানে লেখালিখি করি। গল্প লিখি মূলত।’

‘বেশ। ভালো ভালো গল্প লিইখেন তাহলে। ভালো থাকবেন।’

‘জি অবশ্যই। আপনিও ভালো থাকুন।’

.

লেখা: জামসেদুর রহমান সজীব

১৮ এপ্রিল ২০২১

Tags:

About author
আমি গল্প এবং বই প্রেমিক একজন মানুষ। গল্প এবং বই পড়তে খুবই ভালোবাসি। যেখানেই যে গল্প অথবা কাহিনী খুজে পাই সেগুলো সংগ্রহ করি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি। আমি নিজেও কয়েকটি গল্প লিখেছি তবে সেগুলোর সংখ্যাটা খুবই সামান্য।