গল্প বিশ্বাসঘাতক

  • Share this:

মিমিকে বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না। অনেকটা কৌতুহল নিয়ে মিমির বিছানার কাছে গিয়ে ওর কপালে খানিকটা স্পর্শ করে ডাক দিতে যাবো ঠিক তার পরক্ষণেই আমার হৃদপিন্ডে একটা ধুক করে প্রকম্পন হলো। আমি আকস্মাৎ ওর নিকট থেকে কিছুটা দূরে সরে গেলাম। আর ঠিক পরমুহূর্তেই মিমিকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে উঠলাম। পাশের রুম থেকে আমার মা চিৎকার শুনে দৌড়ে এসে ঘটনার আকস্মিকতায় তিনিও হতভম্ব হয়ে স্থিরচিত্তে দাঁড়িয়ে রইলেন।

মিমিকে আমি বিয়ে করেছিলাম বাবা মায়ের পছন্দেই। জীবনে কখনো প্রেম করিনি আর এসবে আমার আগ্রহও ছিলোনা একদম। একদিন হুট করে মা নিয়ে গেলেন মেয়ে দেখতে আর সেদিন আমি সত্যিই মিমির সৌন্দর্য্যে বিমোহিত হয়ে নিজেকে আর আটকে রাখতে পারিনি। কোনোকিছু না ভেবেই হ্যাঁ বলে দিয়েছিলাম। এরপর সব কিছুর পাঠ চুকিয়ে অবশেষে মিমিকে আমি নিজের ঘরের বউও করে আনলাম। লোকমুখে অনেক শুনেছি যে সুন্দরী মেয়েরা একটু অহংকারী হয় আর স্বামীকে তেমন পাত্তা দেয়না। কিন্তু মিমি ছিলো তার সম্পূর্ণ উল্টো তবে একটা বিষয় আমার নিকট বেশ খারাপ লাগতে আর তা হলো মিমি প্রয়োজন ছাড়া একটিও কথা বলতো না। অফিস শেষে বাড়ি ফিরলে ওকে সামনে বসিয়ে কেবল আমিই বক বক করতাম আর মাঝেমধ্যে ও কেবল হু হা শব্দ করতো আর আমার সামনেই অন্যমনস্ক হয়ে বসে থাকতো। আমি প্রায়শই মিমিকে জিজ্ঞেস করতাম,

-আচ্ছা মিমি! সবসময়তো আমিই কথা বলি কিন্তু তুমিতো কিছুই বলোনা আর তুমি মাঝেমধ্যেই কোথায় হারিয়ে যাও বলোতো?

আমার কথা শুনে মিমি ক্ষানিকটা মায়ামাখা হাসি দিয়ে বলে,

-দুইজনই যদি বক্তা হই তাহলে শ্রোতা হবে কে?

মিমির যুক্তি শুনে আমি ক্ষানিকটা মুচকি হাসি দিয়ে বললাম,

-আচ্ছা একটা সত্যি কথা বলোতো, তুমি কী আমার সাথে সত্যিই সুখে আছো?

-সুখে আছি মানে? তোমার মতো স্বামী পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। একজন স্বামী যে তাঁর স্ত্রীকে এতোটা সময় দেয় এর থেকে আর বেশি সুখ কী থাকতে পারে বলোতো?

মিমির কথা শুনে স্বভাবতই আমার চোখ দুটো আনন্দের জোয়ারে ক্ষানিকটা ঝাপসা হয়ে এলো। আমার পরিবারের মানুষগুলোও না কেমন যেন? মিমিকে তাঁরা এতোটাই ভালোবাসে যে আমি আপন ছেলে হওয়া সত্ত্বেও আমার প্রতি ভালোবাসাটা যেন নিতান্তই তুচ্ছ। লোকে বলে বেশি সুখ কখনোই ভালোনা কারণ এটা নাকি ঝড় আসার আগাম বার্তা। আমাদের পরিবারের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই হয়েছিলো।

একদিন মিমি আমাকে হুট করে বলে ওর বুকে নাকি মাঝেমধ্যেই প্রচন্ড ব্যাথা হয়। আমি অনেকটা কৌতুহল আর ভয়মাখা কন্ঠে বলে উঠলাম,

-কবে থেকে ব্যাথা হচ্ছে?

মিমি কিছুটা ইতঃস্তত ভঙ্গিতে বললো,

-এই দু তিন মাস হবে।

আমি ওর কথা শুনে বেশ কিছুটা অবাক হয়ে পরক্ষণেই ওকে রাগান্বিত ভঙ্গিতে বললাম,

-মানে? এতোদিন তোমার বুকে ব্যাথা আর আমাকে কিছুই জানাওনি? এক্ষণি ডাক্তারের নিকট চলো।

সেদিন আমি ডাক্তারের নিকট মিমিকে নিয়ে গিয়েছিলাম ঠিকই তবে আমার হৃদয়টা যে এভাবে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে তা যেন আমার ভাবনাতেই ছিলোনা। ডাক্তারকে আমি বারবার জিজ্ঞেস করছিলাম,

-আপনি রিপোর্ট ঠিক ভাবে দেখেছেনতো? আপনি নিশ্চই কোথাও ভুল করছেন।

ডাক্তার বারবার আমার একই প্রশ্ন শুনে খানিকটা বিরক্ত হয়েই বললেন,

-আরে ভাই আমরাতো আর ঘাস খেয়ে ডাক্তার হইনি। আমি আপনাকে বারবার বলছি যে আপনার স্ত্রী ক্যান্সারের লাষ্ট স্টেজে আছে। আপনার যদি এতোই সন্দেহ থাকে তবে অন্য কাউকে দেখাতে পারেন।

ডাক্তারের কথা শুনে আমি সত্যিই স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। আমার শূণ্য আকাশটা যেন বায়ুমন্ডলহীন এক নিকষ কালো অন্ধকারে রূপ নিয়েছিলো। নিজের দুঃখকে বলিদান দিয়ে আমি চেষ্টা করেছিলাম যাতে মিমি নিজের অসুস্থতার কথা না জানতে পারে। আমার পরিবারে এই দুঃসংবাদ শোনার পর স্বভাবতই সকলের মাথায় বাজ পরার মতো এক চেতনার আবির্ভাব হয়েছিলো। আমি হাজারো চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম এতবড় একটি ঘটনা আড়াল করে মিমিকে সুস্থ করে তোলার। কিন্তু আমি পারিনি না পারিনি প্রভুর ক্ষমতার উর্ধ্বে যেতে।

দুইদিন চলে গেছে কিন্তু ঘরের মানুষগুলোর মাঝে আর সেই সুখের আমেজটা নেই। আমার মা এখনও মাঝেমধ্যেই মিমিকে হারানোর কষ্টে মানসিক রোগীর ন্যায় ঢুকরে কেঁদে উঠেন। বাবা বেলকনিতে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা অদূর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন আর ছোট বোনটা যেন কাঁদতে কাঁদতে নিজের চোখের অবশিষ্ট জল টুকুও খুইয়ে ফেলেছে।

বিকালে হঠাৎই আলমারী থেকে মিমিকে দেয়া আমার প্রথম উপহারের শাড়িটা বের করতে যাবো ঠিক তখন একটি বাদামী রংয়ের ডায়েরী আলমারী থেকে মেঝেতে পরে গেলো। অনেকটা কৌতুহল নিয়ে ডায়েরীটা হাতে করে মিমির শখের হেলানো চেয়ারটাতে বসে প্রথম পৃষ্টা খুলতেই একটি কালির কারুকার্যে লেখা নাম দেখতে পেলাম। সামির, কিন্তু আমারতো কোনোকালেই সামির নাম ছিলোনা। আস্তে আস্তে পৃষ্টা উল্টিয়ে যতই ডায়েরীর লেখাগুলো পড়ছি ততই আমার হাতের কম্পন গতি বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। তার মানে মিমি বিয়ের আগে সামির নামে কাউকে ভালোবাসতো?

সামির, তুমি হয়তো আমাকে অনেক বিশ্বাসঘাতক ভাবছো কিন্তু বিশ্বাস করো আমি তোমার দুর্বল অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে তোমাকে ছেড়ে যাইনি। বাবামা আমাকে বাধ্য করেছিলেন তোমাকে ছেড়ে দিতে। আচ্ছা তুমিই বলো বাবা মা যদি বলে তাঁদেরকে নয়তো তোমাকে এই দুইয়ের একটি বেছে নিতে তখন আমার কী করা উচিৎ? আচ্ছা কোনো সন্তান কী তাঁদের বাবামায়ের দোয়া ছাড়া সুখি হতে পারবে?...

.

জানো? আমার স্বামীটা নাহ আমার খুব খেয়াল রাখে একদম ঠিক তোমার মতোই। কিন্তু তবুও আমি তাকে তোমার স্থানে বসাতে পারিনি এমনকি বহুবার চেষ্টা করেও না। আমার চোখ থেকে এখন একটুও জল বের হয়না কারণ প্রতিরাতে তোমার জন্য কাঁদতে কাঁদতে আমার চোখ শুকিয়ে গিয়েছে আর আগের মতো আমি কথাও বলিনা কিন্তু আমার স্বামীটা খুব বক বক করে। এসব আমার কাছে একটুও বিরক্ত লাগেনা জানোতো? কারণ ওর চেহারার মাঝেই আমি তোমাকে খুঁজে পাই।..

 

ইদানিং বুকে প্রচন্ড ব্যাথা হচ্ছে মনে হয় বাঁচবোনা। আচ্ছা তুমি কী কখনো এই ডায়েরীটা পড়ার সুযোগ পাবে? আর পেলেও কী তুমি একটুখানি পড়ে দেখবে নাকি আমার প্রতি ঘৃণা থেকে এটা ছুড়ে ফেলে দিবে?...

.

জানো সামির, আমার স্বামী আর শ্বশুর বাড়ির মানুষগুলো আমাকে এতোই ভালোবাসে যে আমার ক্যান্সারের কথা তাঁরা আমার থেকে আড়াল করে রেখেছে যাতে আমি জেনে কষ্ট না পাই। অথচ আমি কিন্তু অনেক আগেই এটা জেনে ফেলেছি।..

.

জানো সামির, এই কদিন আমার স্বামী আমার প্রতি যতটা খেয়াল রেখেছে তাতে আমি যেন তাঁর প্রতি বিন্দু বিন্দু ভালোবাসা অনুভব করছি কিন্তু তোমার পাল্লাটা সবসময় ভারীই থাকবে। তুমি একদিন খুব বড় হবে আর সেদিন আমাকে নিজের প্রভাবপ্রতিপত্তিও দেখাতে আসবে কিন্তু কষ্টের কথা হলো আমি সেদিন লজ্জ্বা পাবার সুযোগটাই পাবোনা কারণ তাঁর আগেই আমার পরকালের ট্রেনে উঠতে হবে..

.

ডায়েরীর এতটুকু পড়ার পর আমি আর স্থির থাকতে পারলামনা। কোনো এক অজানা কারণে আমি ডায়েরীটা জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলাম।..

.

মিমি মারা যাবার পাঁচ বছর হয়ে গেছে। পরিবারের সবাই এখন শোক কাঁটিয়ে উঠে আমাকে দ্বিতীয় বিয়ে করার কথাও বলেছে। কিন্তু আমি বাবা মাকে বলে দিয়েছি বাকি জীবনটা একাই পার করে দিবো তাই তাঁরাও আর জেরা করেনি। আজ হঠাৎই অফিস থেকে বাসায় ফিরবো ঠিক তখনি দেখতে পেলাম একজন স্যুট কোর্ট পড়া যুবক নিজের দামী গাড়ি থেকে নেমে আমার দিকে এগিয়ে আসলেন এবং হাতটা আমার দিকে এগিয়ে দিলেন। আমিও কোনোকিছু না ভেবেই হাতটা বাড়িয়ে স্যালুট করলাম,

-কী ভাই অবাক লাগছে তাইতো? লাগারই কথা। আপনি আমাকে না চিনলেও আপনার স্ত্রী খুব ভালো করেই চিনে আমাকে। জানেনতো, মেয়ে হলো এমন জাতি যারা টাকার কাছে নিজের দেহকে অকাতরে বিলিয়ে দিতেও অনিচ্ছাবোধ করেনা। একসময় আমার টাকা ছিলোনা বলে আপনার স্ত্রী আমাকে হেয় করে আমার হৃদয় চুরমার করে চলে গিয়েছিলো। আমি চাইলেই তখন নিজেকে শেষ করে দিতে পারতাম কিন্তু তা করিনি কারণ ওকে দেখাতে হবেতো যে আমিও পারি টাকা ইনকাম করতে আর গাড়ি বাড়ি করতে। আজ আমার সব কিছু আছে জানেন কিন্তু একটি জিনিস আমার আশেপাশে দেখলেই আমার মাথায় আগুন ধরে যায় আর তা হলো নারী।

-আপনার নামটা সামির তাইতো?

আমার কথা শুনে সে খানিকটা অবাক নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,

-আপনি জানলেন কীভাবে?

-জেনেছি কোনো একভাবে। তবে আপনার জন্য আমার স্ত্রী একটি উপহার আমানত রেখেছিলো আর বলেছিলো আপনার সাথে যদি কোনোদিন দেখা হয় তবে সেটা আপনাকে দিয়ে দিতে।

এই বলেই নিজের অফিসের সাইড ব্যাগ থেকে ডায়েরীটা বের করে সামিরের দিকে এগিয়ে দিলাম।...

.

পরদিন যখন অফিস শেষে বের হবো ঠিক তখন অনেকটা দ্রুতগতিতে সামির আমার হাতটা অনেকটা অসহায়ের মতো ধরে বললো,

-ভাই প্লিজ, একবার আমাকে মিমির সাথে কথা বলার সুযোগ করে দিন। আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি আর কোনোদিন আপনার নিকট কিছু চাইতো আসবোনা। আমি শুধু ওর নিকট একবার ক্ষমা চাইবো।

-চলুন তবে।

আমার কথা শুনে সামির অনেকটা উৎফুল্ল মুখোবয়বে আমার সাথে এগিয়ে চললো।

-একি ভাই এখানে নিয়ে আসলেন কেন? এটাতো কবরস্থান।

-এখানেইতো মিমি শুয়ে আছে। ও আসলেই স্বার্থপর জানেনতো, ও শুধু আপনার সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করেনি বরং আমাকেও নিজের মায়ার বাধনে আটকে রেখে ওখানে একা একা শুয়ে আছে। ওর কী লজ্জ্বা হওয়া উচিৎ না?

আমার কথা শুনে সামির একনয়নে মিমির কবরের দিকে তাকিয়ে টুপ টুপ করে নিজের চোখের জল ফেলছে। আর পরক্ষণেই নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে ধুপ করে মাটিতে বসে পরলো সামির। আমি আর সেখানে একমুহূর্ত না দাঁড়িয়ে উল্টোপথে হাঁটা ধরলাম। আমার চোখে আজ কোনো জল নেই কারণ সবটুকুই শুকিয়ে গেছে অনেক আগেই এখন নাহয় সামিরের চোখের জলটুকুও শুষে নিক ঐ বিশ্বাসঘাতক সম্বোধন করা মিমি নামের মেয়েটি।

.

(সমাপ্ত)

.

Misk Al Maruf

Tags:

About author
আমি গল্প এবং বই প্রেমিক একজন মানুষ। গল্প এবং বই পড়তে খুবই ভালোবাসি। যেখানেই যে গল্প অথবা কাহিনী খুজে পাই সেগুলো সংগ্রহ করি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি। আমি নিজেও কয়েকটি গল্প লিখেছি তবে সেগুলোর সংখ্যাটা খুবই সামান্য।