গল্প: বোকা ছেলে

  • Share this:

আব্বা রুমে আসায় ধড়ফড় করে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালাম আমি। আর্মি অফিসারের ন্যায় কপালে হাত ঠেকিয়ে স্যালুট জানালাম। আব্বা হাতের ইশারায় আমাকে থামালেন। বিছানায় বসতে বললেন। বুকের ভেতর ছোটখাটো ঝড় শুরু হয়েছে। সাধারণত বিশেষ কোন দরকার ছাড়া আব্বা আমার রুমে আসেন না। তিনি বসলেন। আমিও বসলাম।

‘আব্বা, কিছু বলবা?’

‘হ। তোর মা বললো ইদানিং নাকি সারারাত জেগে থাকিস। কাহিনী কী? মেয়েটা কে?’

‘কিহ! কোন মেয়ে? কী বলো এইসব?’

‘নাটক করিস না। তোর চাইতে বেশি নাটক দেখি আমি। ইউটিউবের কোন নাটক দেখা বাকি নাই। এই যে দেশি নাটকগুলোতে মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ। কে বানায়? আমি বানাই।’

‘তা মানলাম। কিন্তু তুমি যেটা ভাবতেছো তেমন কিছুই না। ইদানিং ফ্রিল্যান্সারের কাজ শিখতেছি। তাই রাত জাগি। কোন মেয়ে ঘটিত ব্যাপার নাই।’

‘হইছে। বাপরে বুঝাইস না। আমি তোর বয়স পার করে আসছি। তা ঘনঘন ছাদে যাস কেন? মেয়েটা কে?’

‘আবারও একই কথা বলো কেন! কোন মেয়েফেয়ে নাই। ছাদে যাই ঠেলায় পড়ে। রাউটারে ঠিকঠাক নেট পায় না। মাঝে মধ্যে নেটওয়ার্ক পেতে ছাদে যেতে হয়!’

নিজের কথায় নিজেই শরম পেয়ে গেলাম। মিথ্যারও একটা লিমিট আছে। সেটাকে এভাবে ক্রস করবো ভাবতেও পারিনি। চতুর্থ তলায় বাসা, আর দশ তলার পর গিয়ে ছাদ। সেখানে কীভাবে রাউটারের নেট ভালো পাওয়া যায় তা আমার জানা নেই। আব্বা সরলসোজা মানুষ। তিনি ব্যাপারটা ধরতে পারবেন না ভেবে হুট করে এই মিথ্যাটা বলে দিসি। না বলে উপায়ও নেই। এখন যদি সত্যটা বলি যে, মাঝে মধ্যে বিড়ি খাওয়ার নেশায় ছাদে যাই, তাহলে আমার পিঠের ছাল তুলে ঘরের পাপোশ বানিয়ে ফেলবে।

‘নেটওয়ার্ক পেতে ছাদে যাওয়া লাগে নাকি। আমার বন্ধুরা বিদেশ থেকে ভিডিও কল দেয়, আমি যখন তখন ঘরে বসেই আরামে কথা বলতে পারি। আর তুই বলতেছিস ছাদ ছাড়া নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। এইসব ভুগিজুগি বাপরে বুঝাইস না। বল মেয়েটা কে?’

‘তুমি ভুল বুঝতেছো আব্বা। কোন মেয়ে নাই এখানে।’

‘আচ্ছা ওয়েট। পাশের বিল্ডিংয়ের মেয়েটা কে?’

‘আবার! কোন মেয়ে? কেমন মেয়ে? কিসের মেয়ে?’ কথা বলতে গিয়ে গলা শুকিয়ে আসে আমার। ঘনঘন কয়েকবার ঢোক গিললাম। আব্বার উপর ভরসা নাই। তিনি একবার মনস্থির করলে তালকে প্রেসারে ফেলে তিল বানিয়ে দেবার ক্ষমতা রাখেন।

‘আমি বুঝছি।’

‘কী বুঝছো?’

‘যেইটা তুই বুঝাইতে চাস না। থাক। গেলাম।’

আব্বা স্লো মোশনে আমার রুম ত্যাগ করলেন। দরজা ভিড়ানোর আগে খুব সরু চোখে আমার দিকে চাইলেন। আমি হা করে তার দিকে তাকিয়ে। অমনি চোখ টিপলেন তিনি। কেন? হোয়াই? এই চোখ টেপার পেছনে কী রহস্য থাকতে পারে? আমি হাজার ভেবেও কূল-কিনারা করে উঠতে পারলাম না।

.

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর ভূত দেখার মতো চমকে উঠি আমি। কেনই বা চমকাবো না! ঘুম থেকে চোখ মেলার পর দেখি আব্বা বসে আছেন আমার বিছানায়। আমার দিকে হাসিমুখ করে তাকিয়ে আছেন। এই দৃশ্য দেখে কার অবস্থা ঠিক থাকবে! আমি তো একটুর জন্যে বিছানা ভাসাইনি! ভয় কাটাতে নিজের বুকে থুতু ছিটাইলাম। চোখে জল চলে আসছে রীতিমতো।

‘আব্বা তুমি! কিছু বলবা?’

‘হ। গতকাল তো আমার সাথে ধারাবাহিক নাটক করলি। ভেবেছিলি আমি কিছুই বুঝতে পারবো না।’

জানি না আব্বা কী বুঝছে। কিন্তু আমি তার কথার আগামাথা কিছুই বুঝলাম না। চোখের জল গাল বেয়ে বুকে নেমে গেল। প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে। হে খোদা, কোন মুসিবতে পড়বো কে জানে!

‘কী বুঝছো, বলো শুনি।’

‘তুই তো বললি না মেয়েটা কে। আমি ঠিকই বের করে ফেলেছি। পাশের বিল্ডিংয়ের সাদ্দাম সাহেবের মেয়ে, সখিনা। তলে তলে তুই যে টেম্পু চালাস আর পেছনের সীটে সখিনা বসে থাকে, ভেবেছিলি কিছুই বুঝবো না। কিন্তু এখন? কেমন দিলাম?’

একদমই বাজে ভাবে দিসো! বলতে চেয়েও বলতে পারলাম না। কে সাদ্দাম, কে বুশ, কে সখিনা, কাউকেই চিনি না। চেনার মধ্যে শুধু আছোলা বাঁশটাই চিনেছি। যেটা গতকাল থেকে আমাকে দেওয়া শুরু করেছেন আব্বা।

‘আব্বা, তুমি বিশাল বড় একটা ভুল করতেছো।’

‘হ্যা। ঠিক। সহমত। এতদিন ভুলের মধ্যেই ছিলাম। তাই ভুল শুধরানোর তরিকাও এপ্লাই করে এসেছি। সখিনাকে খুব মনে ধরেছে আমাদের। বিয়ের পাকা কথা বলে এসেছি। আগামীকাল আংটি বদল।’

আমি বোকার মতো হা করে আব্বার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এইটা কী হলো! কিছুই জানলাম না, কিছুই বুঝলাম না, ঘরে বসে বসে হাসির পাত্র... সরি, বিয়ের পাত্র হয়ে গেলাম। আমি আব্বার একটা হাত টেনে ধরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম। অনেক অনুনয় বিনয় করে বললাম, আমার এমন সর্বনাশ কইরো না। কিন্তু তিনি কোনভাবেই কিছু শুনলেন না। হাত এবং মুখ দুটোই ঝামটা মেরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। আমাকে একা করে গেলেন, বড্ড একা।

.

মেয়ের বাসায় আংটি বদল করতে যাবার জন্য নতুন কাপড় চোপড় কিনে আনা হলো। পায়জামা, পাঞ্জাবী, পাগড়ি, স্যান্ডেল, রুমাল কিছুই বাদ রইলো না। ভাবখানা এমন যেন আংটি বদল নয়, বিয়ে করতে যাচ্ছি। আব্বার এহেন কান্ডকীর্তি নিয়ে মায়ের সাথে জরুরি আলাপের দরকার ছিল। কিন্তু কোনভাবেই তার নিকটে ভিড়তে দিলেন না আব্বা। কিছু বলতে গেলে ঘুরেফিরে এক কথা বলেন- বাপরে বুঝাইস না। যা ভাগ!

আমার সত্যিই ভেগে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আব্বা-মায়ের চেহারার দিকে তাকিয়ে সেটা আর পেরে উঠি না। এত কষ্ট করে মানুষ করেছেন আমাকে, এখন তাদের মনে কী করে কষ্ট দেই। আমি বুঝলাম, বিধাতার লিখন না যায় খন্ডন। নিজেকে শান্ত্বনা দিলাম- সজীব রে, জন্ম যেহেতু হয়েছে, একদিন না একদিন তো বিয়ে করতেই হবে। তাছাড়া যে কপালে প্রেম নাই, সে কপালে বিয়ে মানে বিশাল কিছু। ডু ইট ব্রো!

আব্বার ডাক শুনে আমার ভাবনা-চিন্তায় ছেদ পড়লো। তিনি দরজা সোজা দাঁড়িয়ে। কঠিন সাজুগুজু করেছেন। একবার মনে হলো, এখন যদি রাজী না হই, আব্বা নিজেই এই বেশভূষা সহকারে বিয়ে সেড়ে আসবে।

‘কিরে! তুই এখনো রেডি হোস নাই?’

‘হবো তো। কুড়ি মিনিট সময় দাও।’

‘তোর কুড়ি মিনিটে ওপাশে মেয়েটা বুড়ি হয়ে যাবে। নাহ, এত দেরি আর সহ্য হয় না। শোন, তুই রেডি হয়ে মেয়ের বাড়িতে চলে আয়। আমি তোর মাকে নিয়ে এখুনি যাচ্ছি। গিয়ে আলাপ সালাপ জমাই। তুই বেশি দেরি করিস না।’

আব্বার কথায় আমি মাথা ঝাকিয়ে সম্মতি জানালাম। তিনি শিস বাজাতে বাজাতে হাঁটা ধরলেন। জীবনে এই প্রথম তাকে শিস বাজাতে দেখলাম। আনমনেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো। হায়রে, আরও কতকিছু যে দেখতে হবে জীবনে!

.

কুড়ি মিনিটের এক মিনিটও বেশি লাগেনি, রীতিমতো জামাই বাবু সেজে পাশের বিল্ডিংয়ে মেয়ের ফ্ল্যাটে গিয়ে উপস্থিত হয়েছি। বুকের ভেতর কেমন জানি করছে। জীবনের প্রথম মেয়ে দেখা, প্রথম আংটি বদল, প্রথম বিয়ের প্রস্তুতি, আবেগের ছড়াছড়ি খুব। গভীর এক শ্বাস টেনে কলিংবেল চাপলাম। ভেতর থেকে কয়েকজনের কণ্ঠ শোনা গেল। ধীর পায়ের শব্দ। দরজা খুলে দিলেন মেয়ের মা, সাবিনা আন্টি। এনাকে আমি চিনি। বাসায় কয়েকবার দেখেছি। কিন্তু কী আশ্চর্য, তার হাসবেন্ড বা মেয়ের চেহারা আমার স্মরণে নাই। অবশ্য সেটা নিয়ে প্যারাও নাই। আজ এমনিতেই দেখা সাক্ষাত হবে। চেনা পরিচিতি বাড়বে। আফটার অল, আমরা একই পরিবারের সদস্য হতে যাচ্ছি।

পাগড়ি বাদে অলমোস্ট সবকিছু পরনে। ব্র্যান্ড নিউ জামাই সেজে গেস্টরুমে বসে আছি। আমার জন্য খাবার দাবার আসলো। কিছুক্ষণ পর সাদ্দাম আঙ্কেল আসলেন। আমার সামনে থাকা সোফায় বসলেন আরাম করে।

‘তুমি সজীব না?’

‘জি আঙ্কেল।’

‘সেই ছোট থাকতে দেখেছিলাম। অনেক বড় হয়ে গেছো। থাকো কই?’

‘জি আঙ্কেল বাসাতেই থাকি।’

‘অহ!’

এইটুকু বলে সেই যে চুপ হলেন আর কোন কথা নেই। আমিও চুপচাপ বসে আছি। সামনে টেবিলভর্তি খাবার দাবার। এভাবেই মিনিট দশেক কেটে গেল। এরপর সাবিনা আন্টি আসলেন। এসে দেখেন আমি কিছুই খাইনি। লক্ষ্মী বাবুর মতোন বসে রয়েছি।

‘সেকি! তুমি দেখি কিছুই খাওনি।’

‘অসুবিধা নেই আন্টি। পরে খাই। ভাবলাম আংটি বদলের আগে খাওয়া দাওয়া কেমন দেখা যায়। তাছাড়া আপনার মেয়েও তো এখনো আসেনি। আচ্ছা আন্টি, আব্বা-মা কোথায়? তারা তো আমার আগে এসেছে। ভেতরে বসতে দিয়েছেন নাকি?’

‘ওয়েট ওয়েট! তুমি এসব কী বলো? আংটি বদল, আমার মেয়ে, তোমার আব্বা-মা... কিছুই তো বুঝলাম না। কাহিনী কী? কোন সমস্যা হয়েছে?’

আঙ্কেল আন্টি দুজনেই আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রয়েছেন। তাদের চেহারা দেখে বুঝতে পারছি, কোন এক অজানা কারণে দুজনেই বেশ আশ্চর্য হয়েছেন। তবে নিশ্চয়ই আমার চাইতে বেশি আশ্চর্য হননি! আমার ছোট্ট মগজে তালগোল পেকে গেছে। কী করবো, কী বলবো বুঝে উঠতে পারছি না। সিচ্যুয়েশন বুঝতে এবং এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের একটাই পথ- আমার আব্বা। আঙ্কেল আন্টিকে তোয়াক্কা না করে আব্বাকে কল দিলাম। কলটা রিসিভ হলো।

‘আব্বা, তুমি কই?’

‘আমি তোর নানুবাড়ি, তোর মায়ের সাথে এসেছি।’

‘কিহ! তোমার না মাকে নিয়ে আন্টিদের বাসায় আসার কথা। আমি এখানে এসে বসে আছি।’

‘তাই নাকি! কই, এমন তো কিছু মনে পড়ে না। আমার তোর নানুবাড়ি আসার কথা, সেখানেই এসেছি। আমরা আগামীকাল ফিরবো।’

‘কী বলো এইসব!’

‘ঠিকই বলি। আঙ্কেল আন্টি যা খেতে দেয় খেয়ে নে। তারপর বাসায় গিয়ে ঘুমা।’

এই বলে কল কেটে দিলেন আব্বা। নিজেকে বড্ড অসহায় লাগছে। মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে জামাই আদর ঠিকই পাবো আমি। তবে সেটা আসামি স্টাইলে! এমন অবস্থায় পড়বো আগে থেকে জানা থাকলে পরনে পায়জামা পাঞ্জাবী নয়, পিঠে ছালা বেঁধে আসতাম। খেয়াল করে দেখি, আঙ্কেল আন্টি তখনো এক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে। আমি জোর করে হাসলাম।

‘হে হে, আব্বা-মা নানুবাড়ি গেছে। আচ্ছা আন্টি, একটা প্রশ্ন করতে পারি?’

‘করো।’

‘আমার জন্য এতগুলো খাবার আনলেন যে! কারণটা জানতে পারি?’

‘তোমার বাবা কল দিয়েছিলেন। বললেন, তারা বেড়াতে যাবেন। ফিরতে দেরি হবে। বাসায় কিছু রান্না করা নেই। তুমি আসলে যেন তোমাকে খেতে দেই।’

‘ও আচ্ছা।’

এই বলে আমি প্রায় হুরমুর করে বেরিয়ে আসলাম সেখান থেকে। যাকে অন্যভাবে জান নিয়ে পালিয়ে আসা বলা যায়। এরপর বাসায় ফেরার পথে কেবল একটা কথাই বারবার মনে হয়েছে, আব্বা আমার সাথে এমন বিটলামি করতে পারলো! লোকটা হাসি তামাশা পছন্দ করে বুঝলাম। কিন্তু তাই বলে এরকম ধোঁকা! আরেকটু হলেই তো আমার মান-ইজ্জত সব ধুলোয় মিশে যেতো।

এই ঘটনার পেছনে নাকি কারণও ছিল। সেটা জেনেছি আরও পরে গিয়ে। আব্বা মাকে বলেছিলেন যে আমার মতো বোকাসোকা ছেলে দুনিয়াতে আরেকটা নাই। মা বিশ্বাস করেননি। তার মতে, আমি বেশ বুদ্ধিমান ছেলে। আব্বা এই কান্ড ঘটিয়ে মাকে ভুল প্রমাণ করলেন। আর আমিও আবিষ্কার করলাম- আমার মতো বোকা ছেলে এই দুনিয়াতে আরেকটা নাই।

.

লেখা: জামসেদুর রহমান সজীব

১১ এপ্রিল ২০২১

About author
আমি গল্প এবং বই প্রেমিক একজন মানুষ। গল্প এবং বই পড়তে খুবই ভালোবাসি। যেখানেই যে গল্প অথবা কাহিনী খুজে পাই সেগুলো সংগ্রহ করি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি। আমি নিজেও কয়েকটি গল্প লিখেছি তবে সেগুলোর সংখ্যাটা খুবই সামান্য।