গল্পঃ সারপ্রাইজ

  • Share this:

মৌনতার সাথে আমার প্রেম আজ দুই বছর হতে চললো৷ এটাকে প্রেম বলবো নাকি এক তরফা ভালোবাসা বলবো সেটা বের করাটা যদিও কঠিন৷ ওর কথাবার্তা আচার-আচরণে বোঝা যায় আমাকে কিছুটা হলেও ভালোবাসে, কিন্তু স্বীকার করেনা৷ শুরু থেকে না বললে পাঠকরা হয়তো বুঝবেন না কিছু, তাই বোঝার সুবিধার্থে প্রথম থেকেই বলছি৷ বৈশাখী মেলায় ওর সাথে আমার প্রথম পরিচয়৷ যদিও তখন আমার আগ্রহ ছিলো ওর বান্ধবী ঐশীর দিকেই৷ ওরা দুজন ক্লাশ টেনে একই ক্লাশে পড়তো আর ঐশী ছিলো নজরকাড়া সুন্দরী৷ মৌনতার কথা বলতে গেলে ও ছিলো সিম্পলের মধ্যে গর্জিয়াস, অর্থাৎ সুন্দরী বলতে যা বোঝায় ঠিক তা নয় আবার ফেলে দেওয়ার মতও নয়৷ ঐশীকে আমার ভালো লাগলেও আমি একজন বাস্তববাদী মানুষ তাই বুঝতে পেরেছিলাম অনন্যা এই সুন্দরী আর যার জন্যই হোক অন্তত আমার জন্য নয়৷ তাই আমি ঐশীর প্রতি আগ্রহ না দেখিয়ে বাস্তববাদীর মত মৌনতার প্রতিই আগ্রহ দেখালাম৷ ও হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি ওরা ছিলো আমার ছোট বোনের বান্ধবী আর আমার বোনের সাথে ঘুরতে এসেছিলো বলেই বোনের সুবাদে আমার সাথে পরিচয়৷ আমার বোনের থেকে নাম্বার দিয়ে যখন মৌনতাকে কল দিলাম তখন সে নাতিশীতোষ্ণ একটা ভাব দেখালো৷ অর্থাৎ কথা বলতে আগ্রহও বোধ করছে না আবার বিরক্তও হচ্ছেনা৷ যেহেতু বিরক্ত হচ্ছেনা সেহেতু আমি কন্টিনিউ কথা চালিয়ে গেলাম৷ এরপর সপ্তাহখানেক কথা বলে আমি যখন প্রপোজ করলাম তখন সে গড়িমড়ি শুরু করলো৷ সে নাকি বিয়ের আগে কোন দিনই প্রেম করবে না, আবার আমার সাথে কথা বলাও বাদ দিলোনা৷

এরপর আমি অনেক কষ্টে ওর মুখ থেকে বের করলাম কেন আমার সাথে প্রেম করতে চায়না৷ ও বললো: "আপনি মানুষটা খুবই ভালো আর সেই জন্য আপনাকে আমার ভালোও লাগে, কিন্তু আপনি সিগারেট খান তাই কোন সিগারেটখোরের সাথে আমার প্রেম করা সম্ভব নয়"৷ ওর কথায় প্রচন্ড আঘাত পেলাম, এরপর দুই মাস আর ওর সামনে যাইনি৷ সামনে না গেলেও বোনের মাধ্যমে খবর রেখেছি ওর ব্যাপারে, কারণ আমার অবর্তমানে রিলেশনে জড়িয়ে যেতে পারে, আর আমার আশংকা অমুলক প্রমাণ করে ও কোন রিলেশনে জড়ায়নি৷ দুই মাস পর ওকে সারপ্রাইজ দিলাম, আমি এই দুই মাস অনেক কষ্টে সিগারেট ছেড়েছি৷ ভেবেছিলাম আমার সারপ্রাইজ পেয়ে ও রিলেশনে রাজি হবে কিন্তু ও এবার নতুন বাহানা করলো, বললো: "আপনি সারাদিনে ফেসবুকে পরে থাকেন, একজন ফেসবুক এডিক্ট মানুষের ভবিষৎ খারাপ৷ তাই আপনার সাথে রিলেশন রাখা সম্ভব নয়"৷ এবার আমি এক মাস পর ওর সামনে হাজির হলাম সারপ্রাইজ দিতে৷ এই এক মাস আমি আর ফেবুতে ঢুঁকিনি এবং আইডিটাও পার্মানেন্টলি ডিজেবল করে দিয়েছি৷ এবার ও নতুন ফতমা বের করলো, যদিও আমি জানি আমাকে ও সামান্য হলেও ভালোবাসে কিন্তু ও বুঝতে পেরেছে আমাকে আঙ্গুলে নাচাতে পারবে তাই নতুন অজুহাত দেখালো৷ ও বললো: "আপনি পড়ালেখায় জঘন্য খারাপ, এত খারাপ যে সামনের বিএ পরীক্ষায় পাশ করতে পারবেন বলে মনে হয়না৷ আর পাশ করলেও রেজাল্ট এত খারাপ হবে যে কোন চাকরিই পাবেন না৷ তাই আমার পক্ষে সম্ভব নয় আপনার সাথে রিলেশন করা"৷ কিন্তু আমি তখন ওর প্রেমে মাতোয়ারা তাই অনন্ত জলিল না হয়েও অসম্ভবকে সম্ভব করে পরীক্ষায় এ প্লাস পেলাম৷ ওকে সারপ্রাইজ দিতে গেলাম, আর ও জানালো: "তোমাকে বিসিএস ক্যাডার হতে হবে, তাহলেই কেবল তোমার সাথে রিলেশন ষ্ট্যাটাস দিবো"৷

মৌনতার কথায় সব করেছি এবার নাহয় বিসিএস পরীক্ষাটাও দিয়ে দেখি ভাগ্যে ছিঁকে ছেঁড়ে কিনা৷ আমি এরপর দীর্ঘ এক মাস খাওয়া আর ঘুম বাদে বাকি সময় কেবল বিসিএস সংক্রান্ত পড়া নিয়েই ব্যস্ত থাকলাম৷ দীর্ঘ পরিশ্রমে আমার শরীর ভেঙ্গে গেলো, কিন্তু আমি পিছপা হলাম না৷ আমাকে যে বিসিএস পাশ করতেই হবে৷ সুবাহানাল্লাহ আমি অনেক পরিশ্রম করে বিসিএস পরীক্ষা দিলাম এবং সৌভাগ্যের সাথে ক্যাডার হয়েও গেলাম৷ আজ ওকে চমৎকার একটা সারপ্রাইজ দেবো৷ আমি সিলেক্ট হয়েছি সেটা মাত্র কয়েকজন জানে আর যারা জানে তাদেরকেও বলে দিয়েছি কাউকে যেন না জানায়৷ আমার বোনকেও বলে দিয়েছি মৌনতাকে না জানাতে, কারণ আমার ভালোবাসার মানুষটাকে আমি নিজে সারপ্রাইজ দিতে চাই৷ যেই মেয়েটাকে আমি এত ভালোবাসি যার জন্য এত পরিশ্রম তাকে অন্য কেউ বলে দিবে এটা মেনে নেওয়ার নয়৷ মৌনতাকে কল করে বললাম: "তোমার জন্য চমৎকার একটা সারপ্রাইজ আছে, আমি জানি তুমি খুবই খুশি হবে সারপ্রাইজটা পেলে৷ আজ বিকেলে কফিশপে এসো৷ পাঁচটায় দেখা করার কথা থাকলেও আমি সাড়ে চারটায় হাজির হলাম, কেননা ওকে সারপ্রাইজ দিতে আমার যে আর তর সইছিলো না৷ ও একদম কাঁটায় কাঁটায় ওর নিয়মিত সময়ানুবর্তিতা দেখিয়ে পাক্কা এক ঘন্টা পরে আসলো৷ আমি বরাবরই আশ্চর্য্য হতাম এত সময়ানুবর্তি মানুষ কিভাবে হতে পারে? ও সব সময়ই ঠিক এক ঘন্টা পরে আসতো, কোন দিন দেখিনি এক মিনিটও এদিক সেদিক হতে৷

ও এসে বসতেই ওয়েটার এক মগ কফি ওর সামনে রাখলো, কেননা আগেই ওয়েটারকে আমি বলে রেখেছিলাম৷ ও কফিতে চুমুক দিয়ে জানতে চাইলো: "কি তোমার সারপ্রাইজ শুনি?" আমি কোন কথা না বলে কাগজের জিনিসটা ওর দিকে এগিয়ে দিলাম, জানি ওটা দেখে ও চমকে যাবে এবং গেলোও তাই! কাঁন্নাজড়িত কন্ঠে বললো: "এতদিন আমার পিছনে ঘুরে আমার কথায় নিজেকে পাল্টে আজ বিসিএস ক্যাডার হয়ে কিনা তুমি বিয়ে করতে যাচ্ছো ঐশীকে? এত বড় প্রতারণা আমার সাথে কেন করলে? আমার ভালোবাসার এই মূল্য দিলে তুমি?" বললাম: "এতদিন আমি তোমার পিছনে ঘুরেছি কারণ এতদিন তুমিই আমার জন্য পার্ফেক্ট কিংবা পার্ফেক্টের চেয়েও বেশি কিছু ছিলে, সেই কারণেই হয়তো তুমি নিজের সমান পার্ফেক্ট নয় বলে আমাকে ভালোবাসোনি কিংবা ভালোবাসলেও সম্পর্কে জড়াতে চাওনি ক্যালকুলেটরে কঠিন হিসাব করে৷ অংক করাটা আমি তোমার কাছ থেকেই শিখেছি৷ আমি হিসাব করলাম এখন আর তুমি আমার জন্য পার্ফেক্ট নও, তাই আমি আমার পার্ফেক্টকেই বিয়ে করতে যাচ্ছি৷

রোমান রায়হান

Tags:

About author
আমি গল্প এবং বই প্রেমিক একজন মানুষ। গল্প এবং বই পড়তে খুবই ভালোবাসি। যেখানেই যে গল্প অথবা কাহিনী খুজে পাই সেগুলো সংগ্রহ করি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি। আমি নিজেও কয়েকটি গল্প লিখেছি তবে সেগুলোর সংখ্যাটা খুবই সামান্য।