বাবার চিঠি

  • Share this:

বাবার মৃত্যুর খবর শুনে যতটা কষ্ট পাওয়ার কথা ছিলো ততটা পেলাম না কিন্তু ফোনের অপরপাশে আমার ছোট বোনটা অনবরত কেঁদেই চলেছে। ছোট বোনকে কোনোরকম সান্ত্বনা দিয়ে বড় ভাইয়াকে তৎক্ষনাৎ কল দিলাম।

-হ্যালো ভাইয়া। বাবা মারা গেছেন।

-হ্যাঁ শুনছি। তো কী করবো এখন?

-এটা কেমন কথা? বাবা মারা গেছে এখন আমাদের বাড়িতে গিয়ে তাঁর দাফন কাফন সম্পন্ন করা উচিৎ না?

-ধুর। এসবতো আমাদের টাকা দিয়াই করা লাগবে। তাতে আমাদের কোনো লাভ আছে?

ভাইয়ার কথা শুনে আমি অনেকটা আমতা আমতা করে বললাম,

-তা অল্পস্বল্প যাই খরচ হোক। এখন আমরা যদি না যাই তাহলে এলাকার মানুষ কী বলবে তা ভাবতে পারছো?

-ধুর এই এলাকার মানুষগুলা আছেই শুধু বা* পাকনামি করার জন্য। অথচ আমাদের মহামান্য পিতা যে আমাদের শুধু জন্মটা দেওয়া বাদে আর কিছু করে নাই সেইটা তাঁরা বলবো না। মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল।

-যাই হোক তুমি ভাবিকে নিয়ে রওয়ানা দেও আমিও দিচ্ছি।

-আচ্ছা ঠিক আছে।

এই বলেই অপর পাশ থেকে আমার বড় ভাই মাহিন কলটি কেঁটে দিলেন।

.

বাবার প্রতি আমার যতটুকু আক্রোশ তার থেকেও বহুগুণ আক্রোশ মাহিন ভাইয়ার। এর কারণটাও বেশ অদ্ভুত কেননা আমার বাবার অঢেল সম্পত্তি থাকার পরও তিনি আমাদের প্রতি সেই অনুযায়ী কখনো সুবিচার করেননি। ছোটবেলাতে আমার বাবার সমপর্যায়ের ব্যক্তিবর্গের ছেলেমেয়েরা যেখানে বড় বড় নামিদামী ইংলিশ মিডিয়ামের স্কুলে পড়ালেখা করতো সেখানে বাবা আমাদের ভর্তি করিয়েছিলেন গ্রামের এক সাধারণ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এমনকি দুপুরে জীবনে কোনোদিন দুটাকা টিফিনের জন্য দিয়েছিলেন কীনা তা নিয়েও বিস্তর সন্দেহ আছে। যখন কোনো আত্মীয়স্বজনের কেউ এসে আমাদের একশ দুইশ টাকা বকশিশ দিতেন তাও বাবা ছিনিয়ে নিতেন এই বলে যে,

-তোমাদের হাতে এতো টাকা মানায় না। ঘরের খাবার খাবা এটাই উত্তম।

আমাদের তিন ভাই বোনের মধ্যে এই নিয়ে প্রচন্ড আক্রোশ থাকলেও বাবার প্রতি সম্মান ও ভয়ের কারণে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারতাম না। আমরা যে এক উঁচু বংশের সন্তান তার কোনো চিহ্নই আমাদের মধ্যে ছিলোনা বরং আমরা চলাফেরা করতাম গ্রামের আর দুটো সাধারণ ছেলেমেয়েদের মতোই। আমাদের তিন ভাই বোন কে প্রতি ঈদে বাবা কেবল এক জোড়া জামা প্যান্ট কিনে দিতেন আর তা দিয়েই পুরো বছর চালিয়ে নিতে হতো।

আমরা তিন ভাই বোন যখন হাই স্কুলে উঠি তখন অনেক কিছুই আমাদের বোধগম্যতার সীমায় ছিলো। একদিন বাবা আমাদের তিন ভাইবোনকে একত্রে করে বললেন,

-শোনো, তোমাদের এই স্কুল লাইফ পর্যন্তই শুধু আমি খরচ দিতে পারবো। কলেজে উঠলে যে যার মতো নিজের খরচ চালিয়ে পড়ালেখা করবা।

বাবার কথা শোনামাত্রই আমরা মানসিকভাবে অনেক ভেঙ্গে পরেছিলাম। কারণ আমাদের তিন ভাই বোনেরই পড়ালেখার প্রতি অনেক আগ্রহ ছিলো কিন্তু বাবা যদি টাকা না দেয় তবে কীভাবে পড়ালেখা করবো এসব নিয়ে আমাদের তিন ভাইবোনের মধ্যে বেশ আলাপ আলোচনা হবার পর আমরা আগে থেকেই সবকিছু ঠিক করে রেখেছিলাম যে পড়ালেখার পাশাপাশি টিউশনি করবো নাহয় পার্ট টাইম জব। ততদিনে আমাদের অন্তরে গেঁথে গিয়েছিলো যে বাবার জীবদ্দশায় আমরা কখনো উচ্চবিত্তদের ন্যায় বাস করতে পারবোনা।

.

মাহিন ভাইয়া যখন পড়ালেখা শেষ করেও কোনো চাকুরী পাচ্ছিলো না তখন অনেকটা নিরুপায় হয়েই বাবার নিকট গিয়েছিলো কিছু টাকার জন্য ব্যবসা করবে বলে। সাথে আমি আর ছোট বোনও ছিলাম, একত্রে থাকার কারণ ছিলো যে আমরা যদি সবাই মাহিন ভাইয়ার হয়ে অনুরোধ করি তবে বাবা অবশ্যই টাকা দিতে পিছপা হবেনা। বাবার নিকট যাওয়ার পর আমাদের ভাবনাকে মাটি চাপা দিয়ে উল্টো বাবা এমন এক সংবাদ আমাদের ভাইবোনকে শুনিয়ে দিলেন যার কারণে বাবার সাথে আমাদের দূরত্বটা যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেল। বাবা বললেন,

-আমি দরকার হয় পুরো গ্রামবাসীর মাঝে টাকা বিলিয়ে দেব তবুও তোমাকে টাকা দিবোনা এমনকি ধার চাইলেও না। আর একটা কথা শুনে রাখো, তোমরা হয়তো ভেবে রেখেছো যে আমি মারা যাবার পর তোমরা আমার সম্পত্তির উত্তরসূরী হবে। তা ভেবে থাকলে এখনই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলো কারণ আমি আমার সব সম্পত্তি একটি এতিমখানার নামে উইল করে রেখেছি। আমি যদি মারা যাই তবে সব সম্পত্তি সেই এতিম খানার ফান্ডে যাবে। তোমরা যদি নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়ে ভালো কিছু করতে পারো তবে ভালো আর না করতে পারলেও আমার কিছু আসে যায়না। এখন তোমরা আসতে পারো।

বাবার এই কথা শোনার পর স্বভাবতই আমরা তিন ভাই বোন চরম আক্রোশ নিয়ে সেই স্থান ত্যাগ করেছিলাম। এমনকি মাহিন ভাইয়া প্রতিজ্ঞা করেছিলেন বাবা বেঁচে থাকতে তিনি কখনো এই ভিটে মাটিতে ফিরে আসবেন না।

.

আমার ছোট বোনকে বিয়ে দেওয়া হয়েছিলো এক উচ্চবিত্ত পরিবারে। কিন্তু বিয়ের কয়েক মাস পরও যখন আমাদের বাড়ি থেকে কোনো উপহার সামগ্রী পাঠানো হচ্ছিলোনা তখন বোনের শ্বশুর বাড়ির লোকজন ওকে প্রায়শই কটু কথা শোনাতো। অতঃপর যখন তাঁরা কোনো এক সূত্রে জানতে পারে যে বাবার কিঞ্চিত পরিমাণ সম্পদও আমার বোন পাবেনা তখন থেকেই বোনের উপর নানান ধরণের অত্যাচার শুরু হয়। আমার বাবা এসব খবর শুনে আর বিন্দুমাত্র অপেক্ষা করেননি বোনকে নিয়ে আসতে। কিন্তু আমরা দুই ভাই সম্পূর্ণ দোষটা বাবার উপরেই দিয়েছিলাম কারণ তিনি যদি তাঁদের চাহিদা মতো সবকিছু দিতেন তবে বোনের নামের পাশে কখনোই ডিভোর্সী নামক কলঙ্কটা জড়াতো না। এরপর বোনকে বিয়ে দেওয়া হয়েছিলো এক সাধারণ স্কুল শিক্ষকের নিকট এমনকি বিয়ের আগে তাকে বলাও হয়েছিলো যে আমার বোনের এক উচ্চ বংশীয় পরিচয় থাকা সত্ত্বেও সে আসলে কিন্তু নিঃস্ব। তবুও অজানা এক কারণে বোনকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিলো সেই ব্যক্তি।

.

বাড়িতে প্রবেশ করার পর কিছু পাড়া প্রতিবেশী আর আমার বোনের আর্তনাদ ব্যতীত আর কারো কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম না। বলে রাখা ভালো যে আমার মা আমার বোনকে জন্ম দেবার সময়েই মারা গিয়েছিলেন তবুও এক অজানা কারণে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেননি।

বাবার দাফনকার্য শেষ করে ভাইয়া সন্ধ্যাতেই চলে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু আমার আর ছোট বোনের জোরাজুরিতে রাতটা থেকে গেলেন। কারণ বাবার প্রতি তাঁর আক্রোশটা এখনও মনে হয় সেই আগের মতোই রয়েছে।

রাতে হঠাৎই অনেকটা কৌতুহলবসত বাবার রুমে প্রবেশ করলাম। প্রায় অনেক বছর পর বাবার রুমে এসে এদিক সেদিক তাকাতে হঠাৎই চোখ গেলো টেবিলের উপরে রাখা একটি কাগজের দিকে। মনের কৌতুহল মেটাতে কাগজটি হাতে নিতেই দেখি বাবার লেখা একটি চিঠি,

.

""প্রিয় মাহিন, মারুফ, মনি

চিঠির শুরুতে প্রিয় লেখাটি দেখে তোমরা নিশ্চই অবাক হচ্ছো। তোমরা হয়তো আমাকে কখনোই নিজের বাবার আসনে বসাতে পারোনি আর এর কারণটাও আমার অজানা নয়। আমি বড় হয়েছিলাম এক এতিমখানায়, আমার বাবা মা কে ছিলো তা আমি কখনোই জানতে পারিনি। আমি একজন নিঃস্ব বালক হয়েও স্বপ্ন দেখতাম জীবনে অনেক বড় কিছু হবো আর সেই ইচ্ছা আর প্রতিজ্ঞার ফলস্বরূপ অশেষ চেষ্টায় আমি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলাম সমাজের এক উচ্চশ্রেণীর কাতারে। কিন্তু আমি চাইনি আমার সন্তানরা আমার কষ্টের টাকাগুলো বিনা পরিশ্রমেই উড়িয়ে দিক বরং আমি চেয়েছিলাম তোমরাও আমার মতোই কষ্ট করে নিজ পরিশ্রমে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত হও।

আর মনিকে আমি বিয়ে দিয়েছিলাম আমারই এক প্রিয় বন্ধুর ছেলের সাথে। কিন্তু ওরা আমার মেয়েকে ভালোবাসেনি বরং ওরা আমার মেয়েকে বিয়ে করেছিলো কেবল অর্থের লোভে। আর অর্থের প্রতি যাদের লোভ বেশি তাঁরা কখনোই আমার মেয়েকে সুখি রাখতে পারবেনা তাই ওকে আমি সেখানে বিন্দু সময়ের জন্যও রাখিনি।

তোমরা হয়তো ভেবেছিলে আমার সম্পত্তির সবটুকুই আমি এতিমখানার নামে দিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু না, আমি তা করিনি। আমার সেই বাণীর একটাই কারণ ছিলো আর তা হলো তোমরা যাতে আমার সম্পদের আশায় বসে না থেকে নিজ লক্ষ্যে পরিপূর্ণভাবে অগ্রসর হতে পারো। আমার সব সম্পত্তির কাগজপত্র কালো ট্রাংকটির ভিতরে রাখা আছে। সব সম্পত্তি আমি তোমাদের নামে লিখে দিয়েছি। এই চিঠিটি যখন তোমাদের হাতে পৌঁছাবে তখন হয়ত আমি এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে দূর বহুদূর পাড়ি জমাবো। ইচ্ছা ছিলো জীবনের শেষ সময়টিতে তোমাদের সবকিছু খুলে বলবো কিন্তু আমার হাতে হয়তো আর সময় নেই তাই কথাগুলো চিঠিতেই লিখে দিলাম। ক্ষমা করে দিয়ো তোমাদের খারাপ বাবাটিকে।

ইতি

তোমাদের অপ্রিয় পিতা

পুরো চিঠিটা পড়ার পর আমার হাত অজানা এক কারণে কাঁপছে, নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে বাবা বলে এক চিৎকার দিয়েই মেঝেতে বসে পরলাম। আমার চিৎকার শুনে পাশের রুম থেকে সবাই দৌঁড়ে এসে জিজ্ঞেস করলো,

-কী হয়েছে?

আমি কম্পমান হাতে তাঁদের দিকে চিঠিটি এগিয়ে দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেল। এতবছর যাবৎ যেই বাবাকে আমরা ঘৃণা করে এসেছি সেই বাবাই যে আমাদের উন্নতির প্রধান হাতিয়ার ছিলেন সেটা ভাবতেই নিজেদেরকে খুব ছোট মনে হচ্ছিলো। এখন খুব আফসোস করে বলতে ইচ্ছে করছে বাবা তুমি কেন চলে গেলে? তুমি কী একটুখানি সময়ের জন্য ফিরে আসতে পারোনাহ? আমরা শুধু তোমার ঐ দুখানা পা ধরে একটুখানি চুমু খেতাম। কিন্তু ইহা কী চাইলেই সম্ভব? কখনোই না। কারণ বাবাতো আমাদের রেখে পাড়ি জমিয়েছেন ঐ দূর আকাশের অন্তরায়। তিনি আর কখনোই ফিরে আসবেন না।

.

(সমাপ্ত)

.

Misk Al Maruf

Tags:

About author
আমি গল্প এবং বই প্রেমিক একজন মানুষ। গল্প এবং বই পড়তে খুবই ভালোবাসি। যেখানেই যে গল্প অথবা কাহিনী খুজে পাই সেগুলো সংগ্রহ করি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি। আমি নিজেও কয়েকটি গল্প লিখেছি তবে সেগুলোর সংখ্যাটা খুবই সামান্য।