ব্রেকাপ_সমাচার

  • Share this:

তাসনুভার সাথে ব্রেকাপ হবার পরে আমি প্রচন্ডরকম ডিপ্রেশনে পড়ে যাই। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সুইসাইড করবো।

বাজার থেকে ইদুর মারার বিষ কিনে এনে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্টও করেছিলাম। আর ক্যাপশনে লিখে দিয়েছিলাম, 'এ জনমে তোমাকে না পেলেও, পরের জনমে তুমি ঠিকই আমার হবে।'

এখান থেকেই তো আমার ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেল। আমার পোস্ট টিতে ১০ মিনিটের মধ্যে ৩৭ টি শেয়ার আর হাজার খানিক লাইক কমেন্ট পড়ে। তখন আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না যে, আমি ভাইরাল হয়ে গিয়েছি। আর তাই তখন বিষ খেয়ে সুইসাইড না করে পোস্টের লাইক- কমেন্ট দেখতে লাগলাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি নিজেও টের পাইনি। সকালে এলাকাবাসীর হৈচৈ শুনে ঘুম ভাঙে। রুম থেকে বেরিয়ে বাইরে আসতেই দেখি এলাকার সব মানুষ আমাদের বাড়ির উঠানে। সবাই আমাকে দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। বাড়ির বারান্দায় ক্যামেরা আর হ্যান্ড মাইক হাতে কয়েকজন ইউটিউবার উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে এক প্রকার মারামারি লেগে গিয়েছে, কে আগে আমার ইন্টারভিউ নিবে সেটা নিয়ে। এমন সময়ে "স্বপ্নের ছোঁয়া" নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলের দালাল টাইপের লোক এসে আমার লুঙ্গির ভাজে ৫০০ টাকা গুঁজে দেয়। আমি তো ৫০০ টাকা পেয়ে মহাখুশি। এটা আমার জীবনের প্রথম ইনকাম। আমি তো মহাখুশি। খুশি মনে "স্বপ্নের ছোঁয়া" ইউটিউব চ্যানেলে ইন্টারভিউ দিতে রাজী হয়ে গেলাম।

কিন্তু ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে আমি মনে ভীষণ রকম কষ্ট পেলাম। এই চ্যানেলের সাংবাদিক একটা ছোটলোক। শালা আমাকে ৫০০ টাকা দিয়েছে বলে কী আমার মাথা কিনে নিয়েছে না-কি! একের পর এক কুরুচিপূর্ণ প্রশ্ন করছে আমাকে। তার কিছু প্রশ্ন ছিল এমন যে,

১. আপনার প্রেমিকার পুরো না কি?

২. প্রেমিকার সঙ্গে আপনি কতবার পাটখেতে গিয়েছেন?

৩. আপনার প্রেমিকা কী আপনাকে খেয়ে ছেড়ে দিয়েছে?

৪. তার মধ্যে এমন কী দেখে আপনি তাকে ভালোবেসেছিলেন? যা অন্য মেয়েদের মধ্যে নেই?

৫. জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং স্বাস্থ্যবিধির ব্যাপারে আপনি এবং আপনার প্রেমিকা কতো টুকু সতর্ক ছিলেন?

৬. আপনাদের ব্রেকাপ কেন হলো? আপনার ইয়ে ছোট নাকি?

প্রশ্ন শুনে আমি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলাম না। কষে একটা চড় দিয়ে তাকে আমার বাড়ি থেকে বের করে দিলাম। যাওয়ার আগে অবশ্য সে আমাকে দেওয়া ৫০০ টাকা ফেরত চেয়েছিল। কিন্তু আমি আমার জীবনের প্রথম ইনকামের টাকা তাকে কেন দিবো? মানলাম যে আমি তার প্রশ্নের উত্তর দেই নাই। কিন্তু এই ধরণের প্রশ্ন গুলো শুনতেও তো একটা পারিশ্রমিক লাগে। একে একে সব গুলো সাংবাদিক কে আমি বাড়ি থেকে বের করে দিলাম। আর ভাবতে লাগলাম একটা সাংবাদিক কতটা বিকৃত মস্তিষ্কের হলে এমন বাজে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন করতে পারে। তাসনুভার সঙ্গে আমার দীর্ঘ দুই বছরের প্রেমের সম্পর্ক। অথচ আমি কখনো তার হাত টাও ধরতে পারিনি। আমি ওর হাত ধরতে গেলেও সে আমাকে ভেংচি কেটে বলে,

"বিয়ের আগে কিছু করা যাবেনা।"

"আমি তো ইচিং বিচিং কিছু-ই করছি না। শুধু একটু তোমার হাত টা ধরতে চাই।"

"এতো ধরাধরি ভালো না। আজ হাত ধরবা। কাল হয়তো হাত ধরে আর পোষাবে না তোমার। তখন আরো কিছু চাইবে। এভাবেই একটা সময়ে খারাপ কিছু হয়ে যাবে।"

তাসনুভা আমি অনেক ভালোবাসি। শুধু ভালোবাসি না। অনেক সম্মান ও করি। আর তাই ওর কথা গুলো মেনে নিয়ে আর কখনো তার হাত টাও ধরতে চাইনি। আর সেখানে খচ্চর সাংবাদিক কী বাজে ভাবেই না প্রশ্ন করলো। আমার ক্ষমতা থাকলে সাংবাদিক কে ফাঁসিতে ঝুলাইতাম। এসব ভাবতে ফেসবুকে ঢুকলাম। ১৩ ঘন্টা হতে না হতেই ছিয়াশি হাজার লাইক-কমেন্ট আর ৭ হাজার মতো শেয়ার হয়েছে আমার সুইসাইড এটেম পোস্ট। এখন আমি রীতিমতো সেলিব্রিটি। পা যেন আমার মাটিতেই পড়তে চাইছে না। সেজন্য গরমের ভেতর বাসার মধ্যেও বুট জুতা পরে আছি। কিছুক্ষণ আগে মা ঘর মুছে গিয়েছে। পরিষ্কার ঘরে জুতা পরে নোংরা করার জন্য মা আমাকে কিছুক্ষণ ঝাড়ু দিয়ে উদুম ক্যালানি দিল। মনের কষ্টে আমি বাসা থেকে বেরিয়ে এলাম। আর বেরিয়ে আসার আগে চিল্লাতে চিল্লাতে মা কে বলে এসেছি,

" একজন সেলিব্রিটি কে তুমি মূল্যায়ন করলে না। এমন একটা দিন আসবে যেদিন...."

আমার পুরো কথা শেষ করতে না দিয়ে মা রান্না ঘর থেকে ডাল ঘুটনি হাতে তেড়ে এলো। আমি অবস্থা বেগতিক দেখে তৎক্ষনাৎ বাসা থেকে পালিয়ে এলাম। অন্যদিন হলে আমি টং ঘরেই বসতাম। কিন্তু আমি তো এখন সেলিব্রিটি। আমি এখন চাইলেও সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা করতে পারবো না। আর তাই বড় একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে লাল চা অর্ডার দিলাম। কিন্তু সেখানে লাল চা না থাকায় কফি খেলাম। ভেবেছিলাম রেস্টুরেন্টের সবাই আমার মতো একজন সেলিব্রিটি কে দেখে ছবি তুলতে এগিয়ে আসবে। কিন্তু কেউ এলো না।

হঠাৎ তাসনুভা এসে আমার সামনে দাঁড়ালো। তারপর চিৎকার করে বললো,

- তুই এসব কি শুরু করেছিস?

তাসনুভা আমাকে সবসময় তুমি করেই ডাকে। তবে যখন ও অনেক বেশি রেগে যায়, তখন তুই করে ডাকে। আমি ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে বললাম,

- কেন তোমার হিংসা হয়? আমাকে সেলিব্রিটি হতে দেখে তোমার এখন আর সহ্য হচ্ছে না। তাই-না?

- তুই ফেসবুকে এইসব কী পোস্ট করেছিস?

- তুমি ব্রেকাপ করতে পারবা। আর আমি পোস্ট করলেই দোষ!

- কখন ব্রেকাপ করলাম?

- কেন গতকাল রাতেই তো তুমি আমার সাথে ব্রেকাপ করে নিয়েছো।

- তুই আমার মেসেজ টা ভালো করে পড়ছিস? ভালো করে পড়ে দেখ আমি তোকে কি লিখেছিলাম।

আমি দ্রুত ইনবক্সে ঢুকে তাসনুভার মেসেজ বের করলাম। তারপর ওকে দেখালাম এই দেখো তুমি ব্রেকাপ লিখেছো। এই কথা বলার সাথে সাথেই তাসনুভা আমার মুখের বা পাশে কষে একটা চড় দিল। চড় টা বেশ জোরেই লেগেছিল। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। এই প্রথম আমি তাসনুভার স্পর্শ অনুভব করলাম। অন্যরকম এক ভালো লাগা কাজ করছিল। কিন্তু এখন আর ভালো লেগে কি লাভ! আমাদের তো ব্রেকাপ হয়ে গিয়েছে। মেসেজ টা আমি আবারও পড়লাম। মেসেজটি লিখা ছিল,

"শোনো কাব্য, তোমার সাথে ব্রেকাপ কখনোই করবো না। সত্যিই তোমাকে অনেক ভালোবাসি আমি। কখনো আমাকে ছেড়ে যেও না।"

পুরো মেসেজটি পড়ার পরে আমি থতমত খেয়ে গেলাম। তখন আমি বোকার মতো পুরো মেসেজ না পড়ে, শুধু প্রথম টুকু পড়েই ভেবেছিলাম তাসনুভা আমার সঙ্গে ব্রেকাপ করে নিয়েছে। কিন্তু এখন আমি বুঝতে পেরেছি দোষ টা আমারই। কি করবো বুঝতে না পেরে, তাসনুভার দিকে মুখটা এগিয়ে দিলাম। তারপর চোখ বন্ধ করে বললাম,

- এক গালে চড় দিলে বিয়ে হয় না।

 

কাব্য গাজী

০৮-০৪-২০২১

Tags:

About author
আমি গল্প এবং বই প্রেমিক একজন মানুষ। গল্প এবং বই পড়তে খুবই ভালোবাসি। যেখানেই যে গল্প অথবা কাহিনী খুজে পাই সেগুলো সংগ্রহ করি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি। আমি নিজেও কয়েকটি গল্প লিখেছি তবে সেগুলোর সংখ্যাটা খুবই সামান্য।