রম্যগল্প: বই দিয়ে প্রপোজ

  • Share this:

পার্কে বসে বসে বাদাম খাচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখ পড়লো পাশের বেঞ্চিতে বসা একটি জুটির ওপর। দেখলাম মজনু ভাই তার নতুন প্রেমিকা তিথিরের সাথে বসে গল্প করছেন।

একটু পরই মজনু ভাই একটি গোলাপ ফুল হাতে তিথিরের সামনে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়লো। বুঝতে আর বাকি রইলো না এটা হলো প্রেয়সীকে প্রপোজ করার প্রথম ধাপ। এরপর নিশ্চয়ই ফুলটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলবে, "জান..কলিজা,বাবু...আই লাভ ইউ। আমি তোমাকে নিজের চাইতেও বেশি ভালোবাসি। তুমি চাইলে একশো একটি নীল পদ্ম তোমায় এনে দিতাম।কিন্তু জানোই তো আজকাল নীলপদ্ম পাওয়া যে কতটা কষ্টকর! তাই এই ফরমালিন মেশানো গোলাপ দিয়েই না-হয় কাজ চালিয়ে নাও। চিন্তা করো না,এই ফুল আগামী সাতদিনেও শুকাবে না..."

ভাবনার ছেদ ঘটতেই খেয়াল হলো মজনু ভাই ইতিমধ্যেই তিথিরকে প্রপোজ করার জন্য উদ্যত হচ্ছেন।

নাহ্! যে করেই হোক তাকে আটকাতে হবে। বাদামের টোঙ্গাটা ফেলে ছুটে গেলাম তাদের দিকে। মজনু ভাইকে থামিয়ে দিয়ে বললাম,

"এটা আপনি কী করছেন মজনু ভাই?"

আমার কথায় হঠাৎ থতমত খেয়ে গেল মজনু ভাই।

নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, "কী করছি মানে?"

"এই যে,এই যুগে এসেও আপনি সামান্য একটা গোলাপ দিয়ে প্রেমিকাকে প্রপোজ করছেন?"

"তাহলে কী করবো?" প্রশ্ন করেই মজনু ভাই আহাম্মকের মতো তাকিয়ে রইলো।

"আরে ভাই,এসব পুরনো পদ্ধতি আর কতদিন চালাবেন? একটু স্মার্ট হন। ফুল দিয়ে প্রপোজ করা বাদ দেন!"

"কী বলিস এসব! ফুল দিয়ে প্রপোজ করবো না তো কী দিয়ে করবো?"

"ক্যান! বই দিয়ে করবেন।"

আমার কথা শুনেই মজনু ভাইয়ের চক্ষু চড়কগাছ।

"বই দিয়ে আবার প্রপোজ করে না-কি কেউ?"

"করবে না ক্যান? করলেই হয়!"

মজনু ভাই আর তার প্রেমিকা এবার আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো। আমি আবারও বলা শুরু করলাম,

"শুনেন ভাই। আমরা সবাই জানি ফুল হলো উন্নতশ্রেণির উদ্ভিদের প্রজনন অঙ্গ। খাঁটি বাংলায় যাকে বলে যৌনাঙ্গ! এবার একটু ভেবে দেখেন,আপনি একটা যৌনাঙ্গ হাতে নিয়ে প্রেমিকাকে প্রপোজ করছেন..."

"ব্যস! চুপ কর তুই।" মজনু ভাই যেন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলো।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টায় ঠান্ডা মাথায় বললাম,

"আরে ভাই রাগেন ক্যান? আমাকে আগে পুরো কথা শেষ করতে তো দিবেন না-কি?"

একরাশ বিরক্তি নিয়ে মজনু ভাই বললেন,

"আচ্ছা ঠিক আছে। যা বলার তাড়াতাড়ি বল।"

"শুনেন তাহলে। এই যে আপনি ফুুল দিয়ে প্রপোজ করছেন এর মাধ্যমে কত বড় ক্ষতি হচ্ছে আপনি জানেন?

মজনু ভাই না সূচক মাথা ঝাঁকাল।

"আমি বলছি,বিশ্ব প্রেমিক সংস্থার জরিপ মতে কেবলমাত্র প্রেমিকাকে প্রপোজ করার জন্য প্রতিবছর সারাবিশ্বে প্রায় পঞ্চাশ কোটির অধিক ফুলের অপচয় হয়,যার বাজারমূল্য প্রায় ১৫ থেকে ২০ কোটি ইউএস ডলার। বিশেষজ্ঞদের ধারণা এভাবে চলতে থাকলে আগামী একশো বছরের মধ্যেই পৃথিবী ফুলশূণ্য হয়ে যাবে।"

"বলিস কী! তাহলে তখনকার ছেলেরা প্রেমিকাকে প্রপোজ করবে কী দিয়ে?"

"রাখেন আপনার প্রপোজ! আগে চিন্তা করেন ফুল দিয়ে প্রপোজ করলে আপনার লাভটা কী? দুদিন পরই তো সেটা পঁচে যাবে,তখন ডাস্টবিনের ময়লা আর ফুলটার মধ্যে কোনো ফারাক থাকবে না। অন্যদিকে বই দিয়ে প্রপোজ করলে সেটা কিন্তু কখনোই পঁচবে না। তাই ভালোবাসাটাও হবে দীর্ঘস্থায়ী।"

মজনু ভাই হো হো করে একগাল হেঁসে আমার পিঠে চাপড় দিয়ে বললেন,

"আরে গাধা,ফুল হলো পবিত্রতার প্রতীক।"

"ফুল যদি পবিত্রতার প্রতীক হয় তবে বইও বন্ধুত্বের প্রতীক। জানেন না বই হলো মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু?"

"হু তা অবশ্য জানি।"

"তাহলে এত প্যাঁচাল করেন ক্যান? স্বয়ং প্রমথ চৌধুরীও বলেছেন,বই পড়া পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শখ। কিন্তু পৃথিবীর কোথাও আপনি এই কথা পাবেন না যে,ফুল ছিঁড়া পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কাজ!"

দেখলাম মজনু ভাই আর কিছু বলছে না। ভাবুক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে নখ কামড়াতে লাগলেন। তিথিরকেও দেখলাম কী যেন চিন্তা করছে। হয়তো আমার বলা কথাগুলোই বারবার ভাবছে।

যাই হোক আমি আর কথা না বাড়িয়ে সেখান থেকে সরে পড়লাম। এমনিতেও আজকাল এত্ত এত্ত প্রেমিক-প্রেমিকার ভিড়ে পার্কে আমার দম বন্ধ লাগে।

সন্ধ্যায় চায়ের দোকানে যেতেই কুদ্দুসের মুখে শুনলাম মজনু ভাই না-কি আমাকে গরুখোঁজা খুঁজছেন। আমি চলে আসার পর না-কি তিথিরও বায়না ধরেছে তাকে বই দিয়ে প্রপোজ করতে হবে। না হলে সে মজনু ভাইকে রিজেক্ট করে দিবে।

কিন্তু মজনু ভাইয়ের পকেট তখন পুরো খালি। যেই একশো টাকা নিয়ে উনি বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন তার দশটাকা গোলাপ আর বাকিটা ফুচকার পেছনেই চলে গেছে। তাই রাগ মেটাতেই এখন ইয়া মোটা বাঁশ নিয়ে আমাকে খুঁজে চলেছেন। কারণ উনার মতে তিথিরের মাথায় বইয়ের ভূতটা আমিই ঢুকিয়েছি।

কুদ্দুসের বর্ণনা শুনেই ভয়ে গলা শুকিয়ে আসলো। বুঝলাম আপাতত কিছুদিনের জন্য গা ঢাকা দিতে হবে। না হলে আমার হাড্ডি-মাংস সব বইয়ের পাতার মতো চ্যাপ্টা হয়ে যাবে।

------------------------------------

লেখা: জোবায়েদ হোসেন

Tags:

About author
আমি গল্প এবং বই প্রেমিক একজন মানুষ। গল্প এবং বই পড়তে খুবই ভালোবাসি। যেখানেই যে গল্প অথবা কাহিনী খুজে পাই সেগুলো সংগ্রহ করি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি। আমি নিজেও কয়েকটি গল্প লিখেছি তবে সেগুলোর সংখ্যাটা খুবই সামান্য।