রম্যঃ পেট ব্যাথা

  • Share this:

রম্যঃ পেট ব্যাথা

মামুন সাহেবের পেটে ব্যথা। ব্যাথার সাথে সাথে তার মনে হচ্ছে নাড়িভুঁড়ি পরস্পর গুড়ুম গুড়ুম মারামারি করে পেঁচিয়ে গেছে।

মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস, চোখে চশমা আর সুন্দর একটা পাঞ্জাবি পরে বেরিয়ে পড়লেন হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। রাস্তায় বেড়িয়েই পড়লেন মহাবিপদে। বাসস্টপেজে লোকে লোকারণ্য। মানুষ এখানে মারামারি ঘষাঘষি করে বাসে উঠে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাতায়াত করছে। তাই তার পেটের মারামারি কে কন্ট্রোল করে এই মারামারি অসম্ভব মনে হলো। কিন্তু উপায় তো নাই, ডাক্তার তাকে দেখাতেই হবে।

প্রায় একঘণ্টা কারো বগলের নিচে, কার দুই পায়ের চিপার মধ্যে দিয়ে গুতাগুতি করে অবশেষে সফল হলেন মামুন সাহেব। বাসে উঠেই সীট পেয়ে বেচারা খুবই খুশি হলেন। এমন ঘটনা দেখার সৌভাগ্য সবার হয় না ভেবে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করলেন।

বাসে উঠে মুখের মাস্ক গলায় নামিয়ে বসার সাথেসাথে কন্ট্রাক্টর এসে দাঁত বের করে বললেন, "স্যার ৫০ টাহা দেন। করোনায় ভাড়া বেশি।"

কন্ডাক্টর এর মুখের পানের পিক হালকা একফোঁটা মামুন সাহেবের ঠিক নাকের উপরে এসে পড়ছে। বেচারা এটা বোঝার পর পেট থেকে এবার নাড়িভুঁড়িই বের করে দেয় এই অবস্থা। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নাকে টিস্যু দিয়ে মুছে নাকের উপর মাস্ক টেনে বললেন, "ভাই ভাড়া ২০ টাকা। ২০টাকার ভাড়ার ৬০% এক্সট্রা নিলে ৩২ টাকা। আমি আপনাকে ৫০ টাকা দিব কেন?"

কন্ডাক্টর আবার দাঁত বের করে খিল করে হেসে দিলেন। এবার তার পানের পিক গিয়ে পড়লো মামুন সাহেবের হাতের উপর। হাসতে হাসতে বললো, "ষাইড পারসেন্ড হইলো আমরা যে স্বাস্থ্যবিধি মানতেছি হ্যারজন্য। আর আপনার পাশের সিড যে ফাঁকা সেইডার ভাড়া দিবেন না? ২ সিডের বিশ বিশ চল্লিশ আর স্বাস্থবিধি বারো। হয় দুইপঞ্চাশ নিলাম পঞ্চাশ। সোজা হিসাব ভাই।"

পানের পিকের ভয়ে আর কিছু বললেন না মামুন সাহেব। পকেট থেকে পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে দিলেন তাড়াতাড়ি করে। তবুও আরেকবার পিক ছড়িয়ে কন্ডাক্টর মুখ খুললো, "যাক আপনি তাড়াতাড়িই বুঝলেন। পাব্লিগরে এই সোজা হিসাবডাই বুঝাইবার পারি না।"

মামুন সাহেব এবার টিস্যু দিয়ে গালের উপরের পিক মুছতে মুছতেই দেখলেন ফোন বাজতেছে। তার স্ত্রী ফোন দিয়েছেন। বেচারা পানের পিক আর বগলের গন্ধে ভালোই রেগেছিলেন। তার সাথে পেট ব্যথা। স্ত্রীর ফোন ধরেই রাগী কণ্ঠে বললেন, "ফোন দিছো ক্যা? আমি মরি নাই। বাসায় যাওয়ার আগে ফোন দিও না। মন মেজাজ ভালো নাই। আমি বাসে।"

তার বউ ঐপাশ থেকে বললো, "এত রাগো কেন? আমাকে কি তোমার কাদির শাহ ভাইয়ের মতো মূল্যহীন মনে হয় নাকি?"

তিনি ভবিষ্যত বিপদ বুঝে নিজেকে কন্ট্রোল করে বললেন, "বাসায় এসে বলবোনি কেন রাগ হইতেছে। এখন রাখি।" এই বলেই বুক পকেটে ফোনটা রেখে আবারও মুখের মাস্কটা গলায় রাখলেন মামুন সাহেব।

প্রায় আধাঘণ্টা পর তিনি হাসপাতালের সামনে এসে পৌঁছালেন। নেমেই অবাক হলেন তিনি। হাজার হাজার মানুষের সমাবেশ। তার মনে পড়লো আজকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে স্বাস্থ্য মন্ত্রাণলয়ের অধীনে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা হচ্ছে। প্রথমে একটু অবাক হলেও হঠাৎ করে খুশি হয়ে গেলেন তিনি। যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় বা নির্দিষ্ট দিনের জন্য করোনাকে সরিয়ে রাখতে পারে সেই সেরা স্বাস্থ্যব্যবস্থায় তার পেটের চিকিৎসা তো ২মিনিটের ব্যাপার।

তিনি সরাসরি হাসপাতালে ঢুকে ইমার্জেন্সিতে আগে গেলেন। ইমার্জেন্সি বিভাগ তাকে ডাক্তার সাবরিনার রুমে যেতে বললো। মামুন সাহেব ডাক্তারের রুমে গিয়ে নিজের শোচনীয় অবস্থায় কথা বললেন। ডাক্তার তাকে নানাবিধ প্রশ্ন করতে করতেই ঘরে ঢুকে পড়লো একজন হেলমেট পড়া মানুষ।

এসেই সরাসরি মামুন সাহেবের পাঞ্জাবির কলার ধরলেন। পেছনে আরেকজন হেলমেট পড়া লোক ঘরে ঢুকলো। সাথে সাথে ফোন এ ক্যামেরা অন করা একটা লোক। মামুন সাহেব কিছু বুঝে ওঠার আগেই কলার ধরা লোকটা বললো, "তুই এখানে কেন?"

মামুন সাহেব উত্তর দিলেন,"আমি রোগী তাই ডাক্তার দেখাতে এসেছি।"

দুই নম্বর হেলমেট ধারী প্রশ্ন করলো, "তোর কি হইছে? তুই যে রোগী তার প্রমাণ দে।"

মামুন সাহেব বিব্রতকর হয়ে বললেন, "আমার পেট ব্যথা ভাই। এখানে যে আসছি এটাই তো প্রমাণ।"

ক্যামেরা অন করা লোক বললো, "আমি সাংবাদিক। আমার সাথে ভংচং করবেন না। দেশে আমার বিরুদ্ধে কোনো আইন নেই। তাড়াতাড়ি মেডিকেল সার্টিফিকেট দেখান,প্রমান দেখান যে আপনি অসুস্থ!"

মামুন সাহেব ভয় পেয়ে কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন। বললেন, "এই ডাক্তারই তো মেডিকেল সার্টিফিকেট দিবে ভাই।"

এক নম্বর হেলমেট আবার জিজ্ঞেস করলো, "তোর পেটের এক্সরে কই? এক্সরে না নিয়ে ডাক্তারের ঘরে কেন?"

মামুন সাহেব বললেন, "ডাক্তার এক্সরে করতে দিলেই করাবো ভাই।"

দুই নং হেলমেটধারী এবার পাঞ্জাবীর বুতাম ধরে বললো, "এক্সরে না কইরা ডাক্তারের কাছে আসো নষ্টামি করার জন্য? এই ডাক্তার এত ইয়াং কেন?"

সাংবাদিক সাহেব আবার বললেন, "আপনার বউকে নিয়ে আসেন নাই কেন?"

এক নং হেলমেটধারী বললো, "সালা তুই হেলমেট পড়োস না, মানে স্বাস্থ্যবিধি মানোস না। এই করোনায় তুই হেলমেট ছাড়া ডাক্তারের রুমে কেন?"

এবার সাংবাদিক বললো, "আপনার বৌকে ফোন দেন মহিলা ডাক্তারের কথা জানে কি না।"

এভাবে কতক্ষণ নানান প্রশ্নের পরে মামুন সাহেব দেখলেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আসছে। মামুন সাহেব একটু আস্থা পেলেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসে হেলমেটধারীদের পায়ে কিছুক্ষণ চেটে তাদের নিয়ে গেলেন। আর মামুন সাহেবকে একটা রুমে আটকে রাখলেন।

মামুন সাহেবের কান্না আসতে লাগলো। আর এদিকে তার পেট ব্যথায় টয়লেটে যেতে হবে। কোনোভাবেই টয়লেটের চাপ কমাতে পারছেন না তিনি। হঠাৎ করেই দেখলেন টিভিতে বাহাত্তর চ্যানেলে তাকে দেখাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে তার সাথে ঘটে যাওয়া সবকিছু দেখাচ্ছে টিভিতে। নিচে শিরোনামেও তাকে নিয়েই লেখা- "ডাক্তারের সাথে খারাপ সম্পর্ক হয়ে যায় মামুন নামের এক দাড়িওয়ালা লোকের। রোগী সেজে অনৈতিক কাজের জন্য আসা। বর্তমানে তিনি হেলমেট ও জনকল্যান বাহিনীর সোনার ছেলেদের হাতে জিম্মি। তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করায় বাহাত্তর টিভি হেলমেট বাহিনীর পায়ে ও পাছায় হাজারো লাল চুম্বন জানায়।"

একটু পরেই দেখলেন এক মহিলা সাংবাদিক বলছেন, "আবার দেখুন সরাসরি ডাক্তারের সাক্ষাৎকার।" তিনি ডাক্তারকে দেখতে পেলেন না। দেখলেন এক অচেনা মহিলা আসছে সামনে। তাকে তিনি কোনোদিনই দেখেন নি। ওই মহিলা লাইভে এসেই বলা শুরু করলেন, "আমার সাথে উনার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে উনি পেট ব্যথার কথা বলে আমাকে দিয়ে পেট বুলিয়ে নেন। "

মামুন সাহেব এটা দেখে এখন সেন্সলেস হবেন হবেন ভাব। এমন সময়ই বাহাত্তর টিভির এক সাংবাদিক লাইভে বলতে শুরু করলেন, "আপনারা জানেন গণমাধ্যমের অধিকার আছে দেশের সব মানুষের ফোনকল চেক করার। সেই অধিকার থেকেই আমরা মামুন সাহেবের ফোনকল চেক করেছি। সরাসরি শুনুন আপনারা।"

মামুন সাহেব চোখ বড় বড় করে তাকালেন। দেখতে পেলেন তার আর তার স্ত্রীর ছবি স্ক্রিনে। তিনি নিজের কণ্ঠ শুনতে পেলেন। তিনি নিজে বলছেন, "দেখো বউ মোছাঃ শারমিন ত্বোহা বেগম, আমি তোমার স্বামী মোঃ মামুন ইসলাম বলছি, আমি তোমাকে ভালোবাসি না আর। আমার ডাঃ সাবরিনার প্রতি আকর্ষণ আছে। আমি পেট ব্যথার কথা বলে আসলে তার সাথে অনৈতিক সম্পর্ক করতে যাচ্ছি। এতে তুমি আমার সাথে থাকতে পারলে থাকবে, না পারলে না।"

তারপর তিনি তার স্ত্রীর কণ্ঠও শুনতে পারলেন। তার স্ত্রী কান্নার সূরে বলছেন, "স্বামী মোঃ মামুন ইসলাম, আপনি হাজার মেয়ের সাথে সম্পর্ক রাখলেও আমি আপনাকে গ্রহণ করবো।"

এটা দেখার পর কেঁদে দিলেন মামুন সাহেব। তার চোখ দিয়ে পানি ছলছল করছে বের হওয়ার জন্য। সাথে সাথে পেট থেকেও কিছু বের হয়ে যাবে যাবে ভাব। তিনি দেখলেন রুমে একটা হেলমেট রেখে গেছে একজন। তিনি ওই হেলমেটের মধ্যে পেট ফাঁকা করলেন। এত কষ্টের মাঝেও তার একটু শান্তি অনুভূত হচ্ছে। তার গোপাল ভাঁড়ের গল্প মনে পড়লো, "পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তির কাজ হলো পেট ফাঁকা করা।"

লেখাঃ Rashed Raihan Shuvo

Tags:

About author
আমি গল্প এবং বই প্রেমিক একজন মানুষ। গল্প এবং বই পড়তে খুবই ভালোবাসি। যেখানেই যে গল্প অথবা কাহিনী খুজে পাই সেগুলো সংগ্রহ করি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি। আমি নিজেও কয়েকটি গল্প লিখেছি তবে সেগুলোর সংখ্যাটা খুবই সামান্য।