বাস্তব এটাই

  • Share this:

বউকে চোরাই মার মারতে হয়। এমন যায়গায় মারবি, যেন কাপড় তুলে কাউকে দেখাতে না পারে।কথাটা আমার শ্বাশুড়িমা বলছিলো তার ছেলেকে।ঈশান মায়ের কথা শুনেছেও কিছু টা, রাত বিরাতে সে এখন আমায় চোরাই মার মারে আর সে এমন যায়গায় মারে আমি চাইলেও কাউকে কাপড় তুলে দেখাতে পারিনা।

আমাদের ধারাবাহিকতা চলছেই কিন্তু এর মধ্যেই আমার ছোট ননদ একদিন ভোর বেলাতেই বাসায় এসে পড়লো।

নিধির শরীরের কোথাও আচড়ের চিহ্ন দেখতে পেলাম না কিন্ত সে ভীষণ অসুস্থ।

রাতের বেলায় শ্বাশুড়িমা সহ ওর কাছে গিয়ে বসলাম,

সুস্থিরে জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে নিধি! ফিরে এলে যে?

নিধি কাদঁতে কাদঁতে তার শাড়ি টা উপরে তুলল পায়ের,

উড়ুর মধ্যেসহ আরো অনেক যায়গায় দেখলাম ছোট বড় অনেক দাগ, ফর্সা অঙ্গ কালো হয়ে গেছে। যায়গায় যায়গায় রক্ত জমাট হয়ে আছে।

নিধি জানালো ওর বর ওকে ঘরে বেধে প্লাস দিয়ে গায়ের চামড়া ধরে টানে।

আঁৎকে উঠলো শ্বাশুড়িমা, এভাবে কেউ মারে? জানোয়ার একটা, নির্ঘাত জানোয়ারের রক্ত নিলয়ের শরীরের বইছে, নাহলে এমন দয়ামায়াহীন ভাবে মারতে পারতো না মানুষের বাচ্চা হলে।

শ্বাশুড়িমার কথা শুনে ঈষৎ হাসলাম আর বললাম,

- মা, নিধির টা তো দেখেছেন। একবার আমার টা দেখুন।

কাপড় তুলে তাকে দেখালাম আর বললাম, অন্যের ছেলে মারলে জানোয়ার আর নিজের ছেলে মারলে মানুষ। বউকে চোরাই মার মারতে হয় এটা যেমন আপনি শিখিয়েছে ঈশান কে ঠিক তেমনি নিলয়ের মা শেখাতেও ভোলেনি।

আমার মা বলছিলো, ঈশানকে বলে তোর শ্বাশুড়িকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দে।এত অযথা ঝামেলা নেওয়ার কি আছে? কাজ কাম তো কিছুই করেনা বুড়ি, অথযা ছড়ি ঘোরায় তোর উপর। আর শোন বেশি মাথায় তুলবি না, সব সময় ডাবন দিয়ে রাখবি।

আর যতদিন না বাইরে পাঠাতে পারছিস ততদিন ঈশানের কাছে একদম ঘেসতে দিবিনা , নাহলে দেখবি কু মন্ত্রণা দিবে আবার ছেলের কানে। ওই বুড়ি বেশি সুবিধার না।আর ঈশান কে একদম হাতের মুঠোয় রাখবি, যত পারবি ওর মায়ের বিরুদ্ধে বিষিয়ে তুলবি।

সেদিন মায়ের সাথে আর কথা বাড়ালাম না, শ্বশুর বাড়ি আসার কিছুদিন পরেই এক সকালে মা কাদঁতে কাদঁতে চলে আসলো,

কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই বলল,

-রবিনের বউ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। ঘরের সব কাজ করেও যায়গা হলোনা রে মা। আমার নিজের হাতে সাজানো সংসার টা এক মুহুর্তেই তছনছ করে দিলো মেয়েটা।

মাকে জিজ্ঞেস করলাম, দাদা কিছু বলেনি?

-তোর দাদা তো বউয়ের কথা শোনে রে মা, আমি যাই বলি সব নাকি মিথ্যা বলি।

ওই মেয়ের কথাই শেষ কথা ওবাড়িতে।

মাকে শুধু এতটুকুই বললাম,-অন্যেকে কষ্ট দিলে যে নিজেকেও পেতে হয় এটা জানো মা?

কিছু দিলে সেটার ডাবল ফেরত নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।সেটা হোক ভালোবাসা বা কষ্ট।তুমি কাউকে সামান্য ভালোবাসলে সে পরিবর্তে তোমায় সামান্য ভালোবাসা দিবেনা বরং তার থেকে আরো বেশিই ভালোবাসা দিবে।আর কষ্ট? কষ্টের ক্ষেত্রেও একই সুচঁ সম আঘাত টাও কখনো হাতির আকার ধারণ করে।

যাই করোনা কেনো ভেবে করবে,ফেরত নেওয়ার অবস্থান আদৌ তোমার আছে কি না?

বিয়ের পরে দু একদিন শ্বাশুড়িকে মা মেনে নিলেও পরের বার মানতে পারিনি, সব সময় বলতো এটা করোনা ওটা করো।

এখানে যেওনা সেখানে যাও,চুন থেকে পান খসলেই নালিশ দিতো ঈশান কে। কিন্তু আমিও কম যাইনি আচ্ছামত শুনিয়ে দিয়েছি বুড়িকে। বাড়িটা এখন আমার, এতদিন তার থাকলেও।ঈশান তার সন্তান হয়েছে তো কি হয়েছে । আমি ওর স্ত্রী, সমস্ত সুখ দুঃখের ভাগীদার আমি হব।ওই বুড়ি কেনো হবে? আর ঢং কত তার কিছু বললেই কেদেঁ ভাসিয়ে দিতো।বুড়িটা মরার পর হাফ ছেড়ে বাচঁলাম যাক আপদ বিদেয় হয়েছে।

আজ আমিও শ্বাশুড়ি হয়েছি, আর আমার ছেলের বৌ আমার মতোই বৌমা হয়েছে। সামান্যতে সেও আমায় দশ কথা শুনিয়ে দেয়, তার অধিকার টাই বেশি আজ এ বাড়িতে। আমি কষ্ট পাচ্ছি, তবে বৌয়ের আজকের ব্যাবহারের জন্য নয়, আমার সেদিনের ব্যাবহারের জন্য, যেদিন আমিও বৌমা ছিলাম কারো।আজ আমিও বুঝি নিজের হাতে গড়া সংসার টা হুট করে কেউ কেড়ে নিলে কেমন লাগে।আজ আমিও বুঝি আমার শ্বাশুড়ির চোখে আসা সেই জলের কতটা মুল্যে।

পনেরো বছর আগে শরীরের টগবগে রক্তের জোরে, যে রমিজ একটা মেয়েকে জোর পূর্বক ধর্ষন করে মেরে ফেলেছিলো তার পনেরো বছর পরে শরীরের এখন আগের মতো জোর নেই কিন্ত ঠিকি অন্য রমিজের মতোই শরীর লোভী অন্য এক ছেলে রমিজের সহ্য যৌবনে পা দেওয়া মেয়েটাকে ধর্ষণ করে হত্যা করতে ভোলেনি।

নিজের করা পাপের দোষ রমিজ কাউকে দিতে না পারলেও অনুশোচনায় ভোগে এই বলেই যে সেদিন কেনো এমন করলাম?

ওই মেয়েটার মতোই আজ আমার মেয়েটাকেও কষ্ট পেয়ে ছটফটিয়ে মরতে হয়েছে নাজানি কত কষ্ট দিয়েছে আমার কলিজাকে শুয়োরের বাচ্চাটা।

রমিজ নিজের মেয়েকে কষ্ট পেতে না দেখলে ধর্ষণ করা সেই মেয়েটাকে কষ্ট পেতে দেখেছে।

ওই মেয়েটাকে ধর্ষণ, হত্যা করে রমিজ যে পৈশাচিক আনন্দ পেয়েছিলো আজ অন্য কেউ ঠিক তারই মেয়েকে ধর্ষণ করে সেই আনন্দ পেয়েছে।

আমাকে ভালোবাসি মুখেই বলে যাও, যদি ভালোবাসতে তাহলে সেক্সুয়াল রিলেশন করতে।

বিশ্বাস থাকলে সব সম্ভব, তুমি যেহেতু ফিজিক্যাল করতে চাওনা সেহেতু তুমি আমায় ভালোবাসো না।

যদি ভালোবাসার প্রমাণ স্বরুপ দেহ দিতে পারো তবেই এসো আমার কাছে আর তাছাড়া ও আমার অনেক ভয় হয় তোমাকে হারানোর, মেয়েদের কাছে সব থেকে বড়

তার সম্মান। এই সম্মান টা যদি তুমি আমায় দিতে পারো তাহলেই বুঝবো তুমি আমায় ভালোবাসো।

সেদিন ভালোবাসার প্রমাণ স্বরুপ রুপা তার দেহ দিয়েছিলো ঠিকই কিন্ত সে পায়নি অর্নব কে।

যাওয়ার আগে ঠিকই অর্নব বলে গেছে, তোমার থেকে যা চাওয়ার ছিলো তা আমি পেয়ে গেছি এখন তোমায় দিয়ে কি করব? আর তাছাড়া ও বিয়ের আগে যে আমাকে তার সতিত্ব দিতে পারে সে যে পরে অন্যকাউকেই দিবেনা তার কি গ্যারান্টি আছে?

লোক সমাজে বাবার স্বীকৃতি ছাড়া বাচ্চা নিয়ে বাচঁতে পারবেনা বলেই রুপা নিজেকে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে নিলো।

এই একই ঘটনাটা অর্নবের জীবনে ঘটেনি কিন্ত একটা মেয়ের সাথে এক অনাগতের প্রাণ ঠিকি চলে গেলো।

ভালোবাসা, প্রেম বা প্রনয় যে নামেই ডাকিনা কেনো, এটা নাকি স্বর্গ থেকে আসে, অনেকে বলে জান্নাতে ফল।

হ্যা ঠিক তাই, পিরিতি জান্নাতের ফল। আর জান্নাতের ফল বলেই যার তার বাগানে ধরেনা এটা।কেবল শুদ্ধ ভালোবাসাতেই এর জন্ম হয়।প্রেম ভালোবাসা প্রনয় অপরাধ নয়, বা ফ্যাশন নয়। যাকে দেখাতে হবে, যার প্রমাণ দিতে হবে। শরীর সেতো আজ আছে কাল নেই, বয়ে যাওয়া নিঃস্বাস টা এখনি যদি নিতে না পারি তো এখনই এই দেহ টা পড়ে রইবে। কিন্তু ভালোবাসার সমাপ্তি টা দেহের সাথে হয়ে যাবেনা।ভালোবাসা শিখেই ভালোবাসুন।

ভালোভাবে বেচেঁ তবেই ভালোবাসু।

★আজকে যেমন ঘরের মেয়েকে বলছেন, বাড়ির মানসম্মান টা নষ্ট করিস না।

ঠিক তেমনি ছেলেকেও বলুন,

অন্যের ঘরের মানসম্মান টা নষ্ট করিস না বাবা।

সচেতন বা শিক্ষা উভয়কেই দিতে হয়।

এর পরে রইলো বাকি সম্পর্ক গুলো, শ্বাশুড়ি, বৌমা, বোন, বা মেয়ে, নিজের সম্পর্ক গুলোকে যেভাবে প্রাধান্য দিচ্ছেন ঠিক সেভাবেই অন্যের গুলোকে দিন।

★মায়ের মতো শ্বাশুড়ি মা হতে পারেনা বলার আছে, মেয়ের মতো বৌমা হয়ে দেখান।

আজকে আপনার মা আপনাকে বকলে আপনি উত্তর দিচ্ছেন না কিন্তু শ্বাশুড়িমা কিছু বললে আপনি উত্তর দিতে ভুলছেন না।মাকে যেমন টা বলেন না তেমন ভাবেই একবার শ্বাশুড়িকে না বলে দেখতে পারেন না?

মেয়েকে যেমন ছাড় দিচ্ছেন সেভাবে বৌমাকে ছাড় দিতে পারেন না? আজকে আপনার মেয়ে বা আপনি যেমন ভাবে বাবার বাড়ির আদর মেয়ে ঠিক তেমন ভাবে ই আপনার বৌদিদি বা বৌমা কারো বাড়ির আদরের মেয়ে।

★স্ত্রী শুধুমাত্র ভাত কাপড়ের জন্যই স্বামীর বাড়িতে পড়ে থাকেনা। দিন মজুরের কাজ করলেও দিব্যি ভাত কাপড়ে বেচেঁ থাকা যায়।একজন স্বামী মানেই স্ত্রীয়ের অলংকার, তাকে অত্যাচার না করে ভালোবাসতে শিখুন। মা বাবাও কোন মেয়েকে শুধু মাত্র ভাত কাপড়ের জন্য আপনার হাতে তুলে দেয়নি। সবার আগে তাদের ধারণা মেয়েকে ভালো রাখা।আজ আপনার মেয়েকে আপনার জামাই অত্যাচার করলে যতটা কষ্ট আপনার মেয়ে পায়, আপনি পান। ঠিক ততটাই কষ্ট আপনার স্ত্রী শ্বশুর ও পায়।

সর্বশেষ আবারো ভালোবাসতে শিখুন, ভালো রাখতে শিখুন, ভালো থেকে ভালো রাখুন।

অন্যের কথায় কান না দিয়ে, নিজে বিবেচনা করে চলুন।

ভালো রাখার মানুষ গুলো আপনাকে চুল ধরে উপরের দিকে টানবে আর আপনার আশেপাশে থাকা নোংরা মস্তিষ্কের মানুষ গুলো আপনাকে বাল ধরে নিচে নামাবে।সো বি কেয়ার ফুল।

 

✍ রাধিকা রাই বর্মণ

Tags:

About author
আমি গল্প এবং বই প্রেমিক একজন মানুষ। গল্প এবং বই পড়তে খুবই ভালোবাসি। যেখানেই যে গল্প অথবা কাহিনী খুজে পাই সেগুলো সংগ্রহ করি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি। আমি নিজেও কয়েকটি গল্প লিখেছি তবে সেগুলোর সংখ্যাটা খুবই সামান্য।