রম্যগল্পঃ শাশুড়ির নাটক

  • Share this:

আমার আর রাত্রির প্রেম অনেক বছরের। অনেক সময় নদীতে যেমন জোয়ার আসে তেমনি ভাটাও নামে। সেই নদীর জোয়ার-ভাটার মতো অনেক জোয়ার ভাটাই আমাদের সম্পর্কে এসেছিল আবার নেমেও গেছে। আরও নতুন করে যে আসবে না তাও বলা যায় না।

রাত্রি আর আমার বিয়ের প্রায় দশ এগারো বছর হতে চলল। সেই ক্যাম্পাসের লাইফ থেকে আজ অব্দি কত প্রেম যে করেছি তার ইয়ত্তা নেই। মাঝে মাঝে মনে হয় রাত্রি আমার জীবনে না এলে হয়তো আমার জীবনটা অসম্পূর্ণ থেকে যেত।

যাকগে সে কথা, আজ বলবো আমাদের ভালোবাসার আরেকটা অধ্যায় আমার শাশুড়ি আম্মাকে নিয়ে। আমার শাশুড়ির সাথে আমার পরিচয় খুবই বাজেভাবে হয়েছিল যা আমি আজীবনেও ভুলতে পারবো না। যেদিন আমার সাথে তার পরিচয় হয় তার আগে আমি জানতামও না তিনি রাত্রির আম্মা ছিলেন।

আমি তখন অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ি। রাত্রিও সেইম ব্যাচ। আসলে আমি ওর এক ব্যাচ সিনিয়র ছিলাম। শুধু ওর সাথে ক্যাম্পাস লাইফ কাটানোর জন্য এক বছর গ্যাপ দিই। তো যথারীতি আমার ক্যাম্পাসে আগে আসার একটা প্রবণতা ছিল। রাত্রির জন্যই হোক অথবা অন্য কিছুর জন্যই হোক ক্যাম্পাসে আগে আসা চাই আমার।

সেদিনও এর হেরফের হলো না। আমি করিডোরের পাশে একটা বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসে আছি। ক্লাসে তখন দু'চারজন লোক ঝাড়ু দিচ্ছিল। ধুলোর কারণে উঠে গিয়ে মাঠের পাশে দাঁড়াই। হঠাৎ পেছন থেকে একজন মেয়েলি কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো, "আপনি কি এই কলেজে পড়েন?"

পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম একজন ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। কিছু মানুষ আছে যাদের চেহারা দেখে বয়স ঠাওর করা যায় না। এই মহিলাও ঠিক এমনই একটা চেহারারই মানুষ। আন্দাজ করলাম কারো অভিভাবক হবেন হয়তো।

উত্তর দিলাম, "জি আমি এই কলেজেরই স্টুডেন্ট।আপনার কি কিছু লাগবে?"

ভদ্রমহিলা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, "আসলে আমি একজনকে খুঁজছি। জানি না সে এসেছে কি না।"

জিজ্ঞেস করলাম, কাকে খুঁজছেন আমাকে বলুন আমি খুঁজে পেতে হেল্প করে দিচ্ছি।"

ভদ্রমহিলা এবার যেন আমাকে বাগে পেয়ে প্রশ্ন ছুড়লেন, "আসলে আমি রাত্রি নামের একটা স্টুডেন্টকে খুঁজছি। এই কলেজেরই থার্ড ইয়ারে পড়ে। ম্যাথম্যাটিকস ডিপার্টমেন্ট।"

রাত্রির নাম শুনে আমার ভ্রু কুঁচকে গেল। জিজ্ঞেস করলাম, "রাত্রির কাছে কীসের কাজ আপনার? আপনি রাত্রির কে হন?"

ভদ্রমহিলা একটু হাসলেন যেন। তারপর বললেন, "আসলে আমি রাত্রির তেমন কিছু হই না। আমার ছেলের জন্য ওকে একটু দেখার জন্যই এসেছি। আচ্ছা মেয়েটার চরিত্র কেমন একটু বলতে পারবা, বাবা? একমাত্র ছেলে আমার তাই একটু খোঁজ খবর নিতেই আসা।"

আমার মাথায় যেন মুহূর্তেই রক্ত চেপে গেল। রাত্রির বিয়ে ঠিক হচ্ছে আর রাত্রি এ বিষয়ে কিছু বলেনি পর্যন্ত আমাকে। আর এই মহিলা এসেছে আমার কাছেই রাত্রির সম্পর্কে জানতে। আর কোনো মানুষ পেল না?

ভদ্রমহিলা আমার কোনো উত্তর না পেয়ে বললেন, "আসলে বাবা মনে হচ্ছে রাত্রিকে তুমি চেনো তাই তোমাকে জিজ্ঞেস কিরলাম। উত্তর না দিতে চাইলে সমস্যা নেই।"

আমি হুড়মুড় করে বললাম, আরে না না আন্টি আমি তো চিন্তা করছিলাম আসলে বলাটা ঠিক হবে কি না।

ভদ্রমহিলা এবার একটা ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করলেন, "কেন বাবা? কোনো সমস্যা আছে না কি?"

আমিও ছাড় দিলাম না। বললাম, "আন্টি আপনাকে দেখে অনেক ভদ্র ঘরেরই মনে হয়। আপনি যার খোঁজে এসেছেন সে আসলে একটা গুন্ডা। গুন্ডা না বলে বরং ডাকাত বলাই ভালো।

ভদ্রমহিলা একহাত দিয়ে মুখ ঢেকে আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "কেন কেন এমন বলছো কেন?"

বললাম, "এই কলেজে এমন কোনো খারাপ কাজ নেই যা সে করে না। গাঞ্জা, সিগারেট, মদ, বিড়ি সব খায়। ছেলেদের সাথে ঘোরে। এমনকি জানেন, মারামারিও করে। এইতো সেদিন দুটো ছেলেকে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়েছে।"

ভদ্রমহিলা হা করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। বাগে পেয়ে গেছি ভেবে আরও বলা শুরু করলাম।

বললাম, "যদি কথা দেন কাউকে বলবেন না তবে একটা কথা বলবো।"

ভদ্রমহিলা আমাকে চোখ দিয়ে আশ্বাস দিলেন।

আমি বললাম, "আসলে আন্টি মেয়েটার চরিত্র একেবারে বাজে। ঐ যে ঐ বিল্ডিংটা দেখছেন না?" আঙুল দিয়ে হোস্টেলের উপর তলা দেখিয়ে দিয়ে বললাম, "ঐ বিল্ডিংয়ের উপর তলার ঐ কর্ণারের রুমে তিন তিনটে ছেলের সাথে ধরা খেয়েছে। ক্যাম্পাস থেকে বহিষ্কার করা হবে বলেছিল ভিসি কিন্তু পরে রাজনীতির চাপে পড়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ভিসি। চিন্তা করতে পারছেন কত বড়ো চরিত্রহীনা মেয়ে। এর সাথে আপনার ছেলের বিয়ে দিলে আপনার ছেলের জীবনটা একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে আন্টি। আমি ভালো মানুষ দেখে আপনাকে বললাম৷ অন্য কেউ হলে ভয়ে মুখই খুলতো না।"

ভদ্রমহিলার মুখ হা হয়ে যেতে দেখে আমি তো ভীষণ খুশি। লাঠি না ভেঙে সাপ মারতে পারলে খুশি তো হবারই কথা৷

অনেক কষ্টে তিনি বললেন, "তোমাকে অনেক ধন্যবাদ বাবা। আমি এসব কিছুই জানতাম না। কী ভয়ানক কাণ্ড!

আমি এসেছিলাম একজনের কথা শুনে যে মেয়েটা না কি ভালো স্বভাবের। ভালো ঘরের মেয়ে শুনেছিলাম কিন্তু তুমি তো আমার চোখ পরিষ্কার করে দিলে বাবা। কী কাণ্ড কী কাণ্ড! আচ্ছা মেয়ের ফ্যামিলি সম্পর্কে কিছু জানো বাবা?"

শুনেছি তারা না কি একটু ভালো..."

আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে আরেকটু যোগ করার জন্য বললাম, "তেমন কিছু জানি না তবে শুনেছি মেয়ের বাবা না কি মার্ডার কেসের আসামি। আর মা না কি বড়ো বড়ো নেতাদের সাথে উঠবস করে। তার উপরে শুনেছি মা'ও না কি মার্ডার কেসের আসামি। ভাবতে পারেন এমন ফ্যামিলি কত বড়ো সাংঘাতিক হতে পারে। এদের সাথে আত্মীয়তা করতে যাবেন না আন্টি।"

ভদ্র মহিলার চেহারায় কেমন যেন ভয় দেখে আমি মনে মনে বললাম এ যাত্রায় হয়তো তিনি আর আগাবেন না।

আরেকটু ভয় পাওয়াতে বললাম, "আন্টি কি দেখা করবেন সেই মেয়ের সাথে?"

ভদ্রমহিলা বললেন, "না, না, বাবা না। আমি এখনই চলে যাবো। তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। একদিন আমার বাসায় চা খাওয়াবো ইনশাআল্লাহ। অনেক বড়ো উপকার করলে।"

আমি তো মনে মনে ইদের আনন্দে আনন্দিত হচ্ছি। রাত্রির হবু সম্পর্ক ভেঙে দিয়ে আনন্দ পাওয়ারই কথা। কিন্তু ভয় হচ্ছে এই মহিলা আবার রাত্রির বাসায় না যায়। মনে তো হচ্ছে যাবে না কিন্তু তবুও যদি যায় তবে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। যদি টদি বাদ দিয়ে ক্লাসে গেলাম। ততক্ষণে ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। রাত্রি এলো না সেদিন। বাসায় গিয়ে রাতে ফোন দিতেই বললো, "কাল আমার বাসায় এসো। তোমার কথা আম্মুকে বলার পরে আম্মু তোমাকে দেখতে চেয়েছে।"

আমি তো একলাফে শোয়া থেকে বসে পড়লাম। দেখতে চাওয়া মানেই আমাদের সম্পর্ক বৈধতা পাওয়া। খুশিতে সেদিন রাতে বলিউডের প্রিয় রোমান্টিক মুভি 'বিবাহ' দেখলাম আবার।

সকালে উঠে দুইবার ব্রাশ করলাম যাতে কোনোরকম দুর্গন্ধের সমস্যা না হয়। এমনিতেও সমস্যা নাই তবুও উত্তেজনায় দুবার করে নিলাম। আলমারিতে রাখা সবচেয়ে সুন্দর জ্যাকেটটা পরে নিলাম। রাত্রির সাথে ডেটে যাওয়ার সময়ও বোধহয় এত সাজিনি। যাকগে সে কথা।

বাইরে থেকে নাস্তা করে এগারোটা নাগাদ রাত্রির বাসার সামনে পৌঁছালাম। রাত্রির জন্য এক তোড়া ফুল নিয়েছিলাম সেটা নিয়েই দাঁড়িয়ে আছি ওদের বাসার গেটের সামনে। কলিংবেল চাপতেই রাত্রি এসে দরজা খুলে দিল। ওর হাতে তোড়াটা তুলে দিতেই ও সেটা নিয়ে ভেতরে চলে গেল। কেমন খটকা লাগলো বিষয়টা। রাত্রি তো এমন করে না। ভাবলাম হয়তো কোনো সমস্যা হয়েছে। ভেতরে গিয়ে সোফায় বসতেই রাত্রি বেরিয়ে এল একটা ট্রে নিয়ে। ট্রে-তে কিছু ফলমূল আর শরবত রাখা। টি-টেবিলে ট্রে'টা রেখে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আমি গুন্ডা, না?

অনেকখানি পথ হেঁটে আমার বেশ তৃষ্ণা আর ক্ষুধা পেয়েছিল। হঠাৎ রাত্রির মুখে এই কথা শোনামাত্র আমার সেই ক্ষুধা আর তৃষ্ণা কোথায় যে হারিয়ে গেল তা টেরই পেলাম না। হঠাৎ কালকের ঘটনা মনে পড়ে গেল আমার। এবং মুহূর্তেই বুঝতে পারলাম সেই মহিলা হয়তো সব বলে দিয়েছে তাদের।

জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বিয়ে ঠিক হচ্ছিল তা তো বলো নাই আমাকে?

ও এবার থতমত খেয়ে বললো, তোমার জন্য সারপ্রাইজ রেখেছিলাম।

জিজ্ঞেস করলাম, সারপ্রাইজ না হার্ট অ্যাটাক রেখেছিলে তা তো বুঝতেই পারছি।

আমাদের কথোপকথনের মাঝখানে কখন যে রাত্রির আম্মা এসে পেছনে দাঁড়িয়েছিল খেয়ালই করিনি। রাত্রির সাথে ঝগড়া করতে করতেই আমি একটু শরবত মুখে দিয়েছিলাম হঠাৎ পেছনে সেই মহিলাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমার মুখ থেকে শরবত ছিটকে বেরিয়ে পড়ল বাইরে। নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি এবং মুচকি হাসছেন। আমি রাত্রিকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই রাত্রি বললো, মা বোসো তোমার জন্যেও চা আনছি।

আমার মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে এলো, মা?

একবার রাত্রির দিকে আরেকবার রাত্রির মায়ের দিকে তাকাতে লাগলাম। লজ্জায় আর শঙ্কায় আমার গলা অব্দি এসিডিটি চলে এসেছে।

রাত্রি হেসে দিয়ে বললো, তুমি না কি বলেছো আমি গুন্ডামি করি ক্যাম্পাসে?

দেখলাম রাত্রির আম্মাও হাসছে।

লজ্জায় অনেকটা মাথা নিচু করেই রেখেছিলাম সেদিন। সেদিন আমার শাশুড়ি খুব হাসলেন আমার কাহিনি নিয়ে। রাত্রির বাবাও এসেছিল তার কিছুক্ষণ পরে৷ তিনিও কাহিনি শুনে বেশ হেসেছিলেন। আমার লজ্জা লাগলেও পরে বুঝতে পেরেছিলাম আমার শাশুড়ি অন্য লেভেলের মানুষ। শুধু আমাকে পরীক্ষা করার জন্য তিনি ইচ্ছে করে ক্যাম্পাসে গিয়েছিলেন। রাত্রি আমার বিষয়ে সব বলে দিয়েছিল তাকে। এবং রাত্রিও এই নাটকের অংশ ছিল। পরে জেনেছিলাম তিনিও না কি সেই ক্যাম্পাসেরই স্টুডেন্ট ছিলেন।

আমার ছেলে হওয়ার দিন রাত্রি যখন ওটির ভেতরে ছিল তখন আমার খুব টেনশন হচ্ছিল দেখে তিনি এগিয়ে এসে বললেন, "অত টেনশন করো না, তোমার গুন্ডা রাত্রি ঠিক হয়ে যাবে। তবে ভয়ের একটা বিষয় আছে।"

ওনার কথার মাঝখানে থেমে যাওয়া দেখে আমার তো কাঁদোকাঁদো অবস্থা।

উনি ফিক করে হেসে বললেন, "গুন্ডার দল কিন্তু ভারী হয়ে যাবে" বলেই আবার হাসলেন। উনার হাসি দেখে আমার কেন যেন অনেকখানি টেনশন কমে গিয়েছিল সেদিন। বুঝেছিলাম কেন শাশুড়িকেও মায়ের মর্যাদা দেওয়া হয়।

 

লেখকঃ বি.এম.পারভেজ রানা

Tags:

About author
আমি গল্প এবং বই প্রেমিক একজন মানুষ। গল্প এবং বই পড়তে খুবই ভালোবাসি। যেখানেই যে গল্প অথবা কাহিনী খুজে পাই সেগুলো সংগ্রহ করি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি। আমি নিজেও কয়েকটি গল্প লিখেছি তবে সেগুলোর সংখ্যাটা খুবই সামান্য।