গল্প: বাড়িয়ে দাও তোমার হাত

  • Share this:

নীরা ইদানিং নিয়ম করে দু’বেলা আসে আমাদের বাসায়। আগে তেমন একটা আসতো না৷ কোন কিছুর প্রয়োজন হলে অথবা ওর আম্মু যদি কখনো আমাদের বাসায় এসে আমার আম্মুর সাথে গল্প করতো তখন ওর আম্মুর সাথে আসতো৷ এছাড়া নীরাকে আমাদের বাসায় দেখা যেত ছুটির দিনগুলোতো৷ ছুটির দিন ছোট বোনটা বাসায় আসে৷ সপ্তাহের অন্যান্য দিন মাদ্রাসাতেই থাকে৷ ছুটির দিনগুলোতে ছোটবোন রুমার সাথে গল্প করে, আড্ডা দেয়, হাসি মাস্তি করে। দুজনে মিলে এটাসেটা রান্না করে৷

নীরা হচ্ছে আমাদের বাড়িওয়ালার ছোট মেয়ে। ছয় মাসের মতো হলো আমরা নীরাদের বাসায় এসেছি৷ নীরা এবং আমি প্রায়ই সমবয়সী। নীরা আমার থেকে দেড় বছরের ছোট হলেও আমি তাকে আপু বলেই ডাকি। যদিও আমাদের মাঝে তেমন একটা কথাবার্তা হয় না। নীরা আর আমি একই ক্লাসে পড়লেও আমাদের প্রতিষ্ঠান ভিন্ন। নীরা এখানকার একটি স্বনামধন্য গার্লস কলেজে পড়ে।

তিনতলা বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় নীরারা থাকে৷ আমরা থাকি তিনতলাতে৷ সুবিধা আছে বটে৷ সিঁড়ি পেরোলেই ছাদ৷ যখন তখন ছাদে যাওয়া যায়। আগে হুটহাট ছাদে চলে যেতাম। এখন ছাদে যাওয়া অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছি। সেটা নীরার জন্য।

বিকেল হলে খুব করে ছাদে যেতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে ছাদে বসে আকাশ দেখি৷ বিশাল আকাশ। সূর্যের অস্ত যাওয়া। পাখির নীড়ে ফেরা। কিন্তু যাওয়া হয় না। নীরাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা। বিকেলবেলা নীরা ছাদে থাকে৷ আগে ছাদে কম আসতো৷ এখন হুটহাট ছাদে চলে আসে। এসে আমাকে খোঁজে। আমাকে পেলেই এটা সেটা নিয়ে কথা বলে৷ অনর্গল বলতেই থাকে৷ আমি মুগ্ধ শ্রোতার মতো শুধু শুনে যাই। এরপর একেক সময় একেকটা অজুহাত দেখিয়ে চলে আসি৷ যদি না পায় তাহলে চুপচাপ চলে যায়।

ছাদে একটা লোহার দোলনা আছে সেটাতে বসে থাকে সারাবিকেল। কোনদিন হেডফোন কানে গুঁজে গান শুনতে শুনতে আকাশ দেখে। কোনদিন গল্পের বই হাতে পড়তে দেখা যায়।

ছাদে আর কোথাও বসার ব্যবস্থা নেই। ছাদের চারপাশে ইট দিয়ে উঁচু দেয়াল দেয়া৷ দেয়ালের কোল ঘেঁষে অনেকগুলো টব সাজানো। ফুল আর ফলের গাছ লাগানো সেগুলোতো৷ বাড়ির চারপাশেও বড় বড় গাছপালা আছে৷ বাড়ির পরিবেশটা ভালো লাগে৷

নীরার সাথে আমার প্রথম কথা হয় কলেজ থেকে ফেরার পথে। সেদিন ছিল ওদের বাসায় আসার আঠারতম দিন। রাস্তা দিয়ে হাঁটলে মাথা কিছুটা নীচু করে হাঁটি৷ ছোটবেলা যখন বাবার সাথে রাস্তায় বের হতাম তখন তিনি এভাবে হাঁটতে বলতেন৷ তখন থেকেই অভ্যাস৷ পিছন থেকে শুনতে পেলাম কেউ একজন ডাকছে আমাকে৷ প্রথমে ভাবলাম আমাকে না। ততক্ষণে নীরা রিকশা নিয়ে আমার সামনে চলে এসেছে। নীরা রিকশা দিয়েই কলেজে যাওয়া আসা করে৷

সাদা ও আসমানী রঙের ইউনিফর্ম পরা৷ মাথায় স্কার্ফ বাঁধা৷ রিকশার বিপরীত পাশে সরে গিয়ে বললো, “আসুন ভাইয়া, একসাথে যাই।”

আমি কী বলবো ভেবে পেলাম না৷ এভাবে পাবলিক প্লেসে একটা সমবয়সী মেয়ের সাথে পাশাপাশি বসে থাকা অসম্ভব ঠেকলো৷ ইতস্তত করে বললাম, “না আপু, ঠিক আছে৷ আমি হেঁটেই যেতে পারবো।”

নীরা হতাশ হলো।

কণ্ঠে অনুরোধ, “আরেহ আসুন না ভাইয়া৷ ভাড়া তো আমি দেব৷ একজায়গাতেই তো যাবো।”

শুনে বড় ভালো লাগলো। কিন্তু মন কিছুতেই সায় দিচ্ছিল না৷ কয়েকবার অনুরোধ করেও যখন দেখলো আমি অনড় তখন বিরক্তি আর ক্ষোভ নিয়ে চলে গেল। আমাকে আর নিতে পারলো না৷

নীরার থেকে দূরত্ব রেখে চলি৷ বাড়িটা হাতছাড়া করতে চাই না৷ বাড়িটা ভালো৷ বাড়িওয়ালা আঙ্কেল শামসুল হক সাহেবও ভালো মনের মানুষ৷ দেখা হলেই সালাম দেই৷ জবাব নিয়ে সহাস্যে জিজ্ঞেস করেন, “কী অবস্থা রাজীব, পড়ালেখা কেমন চলছে?”

“জ্বি ভালো।”

“হুমম। মনযোগ দিয়ে পড়তে হবে৷ পড়ালেখা না করলে জীবনে বড় কিছুই করতে পারবে না।”

বুঝতে পারলাম যে, নীরা আমার প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। আমার ভয় হতে লাগলো৷ যদি নীরার আব্বু আম্মু এটা বুঝে ফেলে তাহলে আমাদেরকে বাড়িটা ছেড়ে দিতে হবে হয়তো।

নীরার সাথে যেন দেখা না হয় সেজন্য যথেষ্ট সতর্ক থাকলাম। দুই তলার সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামার সময় বুকটা ধক ধক করে। এই বুঝি সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো, “কী ব্যাপার ভাইয়া, এরকম পালিয়ে বেড়ান কেন?”

নিজেকে পুরোপুরি ঘরবন্দী করে ফেললাম। রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়ে তখন চুপচাপ ছাদে গিয়ে হাওয়া খেয়ে আসি৷

আগে বাসায় কম আসতো। ছাদে আমাকে না পেয়ে এখন ঘনঘন বাসায় চলে আসে। আমার কাছে বিরক্তিকর লাগে৷ বাড়িওয়ালার মেয়ে। কিছু বলাও যায় না৷ কলিং বেলের আওয়াজ শুনেই বুঝতে পারি কে এসেছে। নীরা এসে কলিং বেল বাজাবে, যতক্ষণ না দরোজা খোলা হবে ততক্ষণ বাজাতেই থাকবে৷ আগে আমি দরোজা খুলে দিতাম। এখন আর ও মুখো হই না৷ আম্মু গিয়ে দরোজা খুলে৷ আম্মু দরোজা খোলা মাত্রই একগাল হেসে বলবে, “এই যে, বিরক্ত করতে চলে এলাম আন্টি”

আম্মু প্রথম দিকে বলতো, “কী যে বলো না বিরক্ত হবো কেন। এসো, ভেতরে এসো৷”

এখন শুধু বলেন, “এসো ভেতরে এসো৷”

তবে নীরা মেয়েটা ভালো। হাসিখুশি সদালাপী মেয়ে৷ নিজেও হাসিখুশি থাকে, অন্যকেও হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করে। অহংকার নেই৷ সাজুগুজু করতেও দেখিনি কখনো৷ অথচ কোন কিছুর অভাব নেই৷ রুমার সাথে ভাব হওয়ার পর একগাদা সাজসামগ্রী দিয়ে দিয়েছে৷ রুমার আবার সাজুগুজু করার শখ খুব৷ বাসায় যতক্ষণ থাকবে একটু পরপর সাজবে। কে জানে মাদ্রাসায় গিয়ে কেমন করে।

নীরা আম্মুর সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করে৷ মাঝে মাঝে আমার রুমেও এসে ঢুঁ মারে৷ এজন্যই তো আসা! পড়া নিয়ে কথা হয়৷ সামনে টেস্ট পরীক্ষা৷ প্রিপারেশন কেমন এসব। আমার কাছে উপন্যাসের বইয়ের সংগ্রহ অনেক৷ সেসব নিয়ে পড়ে৷ প্রতিক্রিয়া জানায়৷ এর বেশি কিছু কখনও বলে না৷ হয়তো বলতে চায় বলতে পারছে না৷ আগের থেকে খানিকটা সুন্দর হয়েছে বলে মনে হয়৷ হয়তো এখন একআধটু সাজার চেষ্টা করে৷ শুনেছি, ভালোবাসা হলে নাকি সবারই এমন হয়। হয়তোবা তাই।

নীরার আম্মুর সম্ভবত চোখে লেগেছে বিষয়টা৷ নীরা যেভাবে ঘনঘন আসে চোখে লাগারই কথা৷ হয়তো নীরাকে শাসিয়েছেন৷ হয়তো বলেছেন, “ওরা আমাদের ভাড়াটিয়া৷ আজ আছে কাল নেই৷ এভাবে ঘনঘন যাওয়া বন্ধ করো৷ এতো পিরিত ভালো না মেয়ে৷”

এসব কেবল আমার ধারণা৷ ধারণা হলেও আমার মতে বাস্তব। এর কারণ হলো, আন্টি আমাকে দেখলে আগে মিষ্টি করে হাসতেন, ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করতেন। এখন দেখা হলে কেমন আছো রাজীব? এটুকুই জিজ্ঞেস করেন। আগের সেই স্বভাবসুলভ হাসি নেই৷ হাসির পরিবর্তে সন্দেহ চোখে তাকান। আমার অস্বস্তি লাগে।

এখন তেমন একটা আসে না নীরা৷ অনেক দিন ধরেই দেখা হয় না নীরার সাথে। কেমন আছে কে জানে?

ছোটবোনের বর্ণনামতে, নীরা আমার মতোই চুপচাপ হয়ে গেছে৷ কারো সাথে তেমন একটা মেশে না। রুমার সাথেও আগের মতো হাসিঠাট্টা করে না। সবসময় একা একা থাকে৷ আগের থেকে শুকিয়ে গেছে অনেকটা৷ শুনে ভীষণ খারাপ লাগলো৷

সন্ধ্যা হবে হবে এমন সময় বাড়ির সামনে একটি এ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়ায়। অজানা আতঙ্কে বুক ধুকপুক করছে৷ কার কী হলো?

কিছুক্ষণ পর শুনি নীরা খুবই অসুস্থ। হাসপাতালে নেয়া হবে। নীরাকে দেখার জন্য মন খুব অস্থির লাগছিল। কিন্তু গেলে সন্দেহ করতে পারে৷ শামসুল হক সাহেব অনেকটা ভেঙে পড়েছেন। তার কোন ছেলে সন্তান নেই। দুই মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে আড়াই বছর প্রায়৷ নাম নাবিলা। আর ছোট মেয়ে নীরা৷

নীরাকে তিনি অত্যধিক ভালোবাসেন।

আঙ্কেল আন্টি দুজনেই হাসপাতালে চলে গেছেন।

আব্বু বাসায় এসে সবটা শুনলেন। তিনি এখনই একবার হাসপাতালে যাবেন বলে ঠিক করলেন। লোকটা একা৷ পাশে থাকা প্রয়োজন৷ সাথে তাদের জন্য রাতের খাবার নিয়ে গেলেন।

কোনদিন নির্দিষ্ট কারো জন্য বিশেষ ভাবে দোয়া করিনি। আজ করতে ইচ্ছে হলো। মাগরিবের নামাজ পড়ে অনেকক্ষণ দোয়া করলাম। নীরা যেন সুস্থ হয়ে যায়। মেয়েটা এমন কেন করলো!

আব্বা রাতেই ফিরে এলেন। আগামীকাল অফিসে যেতে হবে। তারা কেউ ফিরবেন না। ওখানেই থাকবেন। বাবার কাছে শুনলাম নীরার পিত্তপাথর হয়েছে। মানসিক কিছু সমস্যাও দেখে দিয়েছে। নিয়মিত খাবার না খাওয়ায় খাদ্যনালী শুকিয়ে গেছে।

আগামীকাল বারোটায় অপারেশন।

বারবার এড়িয়ে যাওয়া মেয়েটার জন্য হঠাৎ কেমন অস্থিরতা অনুভব করলাম।

রাতে তেমন একটা ঘুম হলো না। খারাপ স্বপ্ন দেখলাম৷ আম্মা আর রুমা নাকি হাসপাতালে যাবে নীরাকে দেখতে। সেই সাথে তাদের জন্য সকালের খাবার নিতে হবে। আমরাও তো খুব ইচ্ছে হচ্ছে যেতে। কিন্তু..

অঙ্ক কষছি। মন বসছে না। রুমা এসে দাঁড়াল আমার পাশে। বললো, “ভাইয়া চলো আমাদের সাথে?”

“আমি গিয়ে কী করবো?”

“আপু কিন্তু তোমার জন্যই অসুস্থ জানো তো?”

আমি নিরুত্তর, নিরুপায়।

রুমা আবার বললো, “এ্যাম্বুলেন্সে উঠার আগে আপু আমাকে বলেছে, তুমি যেনো একবার হলেও দেখতে যাও।”

যাবো কি যাবো না, দ্বিধায় পড়ে গেলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম যাবো। যত যাইহোক মানুষ তো।

নীরা শুয়ে আছে ধবধবে সাদা বিছানায়। রুমা, আম্মু কাছে গিয়ে কুশল বিনিময় করলো৷ বহুদিন পর নীরার কণ্ঠ শুনলাম। কেমন ফ্যাকাশে ফিনফিনে হয়েছে৷

আমি দূরেই দাঁড়িয়ে রইলাম। নীরার আম্মুকে দেখলাম খুবই বিমর্ষ অবস্থা। আমাকে দেখে কাছে ডাকলেন৷ আমি এগিয়ে গেলাম। তিনি নীরার পাশেই বসেছিলেন। উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে বসালেন সেখানে৷ নীরার কানে কানে বললেন, দেখ নীরা রাজীব এসেছে তোকে দেখতে।

নীরা আমার দিকে ফিরে তাকায়৷ গোলগাল মুখটা কেমন শুকিয়ে একটুখানি হয়ে গেছে। কী মনে করে যেন আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কেমন আছো নীরা?”

নীরা হাসে৷ সে হাসি ছড়িয়ে পড়ে ক্লান্ত মুখের সবখানে। বড় মায়া লাগে। নীরা ওর একটা হাত বাড়িয়ে দেয়৷ আমি নীরার আম্মুর দিকে তাকাই৷ তিনি অভয় দেন। আমি আলতো করে মুঠো বন্দী করি নীরার ক্লান্ত হাত, ঝিমিয়ে পড়া আঙুল।

নীরা ওর শক্তিহীন দুর্বল আঙুলগুলো দিয়ে শক্ত করে আমার হাতটা ধরতে চায়। ব্যর্থ হয়। আমি শক্ত করে ধরি। হয়তো মস্তিষ্কের কল্পনা। কোথাও থেকে ভেসে আসছে অনুপমের, “বাড়িয়ে দাও তোমার হাত, আমি আবার তোমার আঙুল ধরতে চাই... ”

 

লেখা: রাজীবুল ইসলাম

Tags:

About author
আমি গল্প এবং বই প্রেমিক একজন মানুষ। গল্প এবং বই পড়তে খুবই ভালোবাসি। যেখানেই যে গল্প অথবা কাহিনী খুজে পাই সেগুলো সংগ্রহ করি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি। আমি নিজেও কয়েকটি গল্প লিখেছি তবে সেগুলোর সংখ্যাটা খুবই সামান্য।