গল্প: জানালার ওপাশে তুমি

  • Share this:

এক.

ভরদুপুরে হঠাৎ বাচ্চাদের চেঁচামেচির শব্দে চন্দ্রার কাঁচা ঘুমটা ভেঙে গেল। সবেমাত্র চোখ দুটো লেগে এসেছিল তার। 'নিশ্চয়ই পাশের বাড়ির ছেলেগুলোর কাজ এটা।' মনে মনে তাদের ভর্ৎসনা করতে করতে কী হচ্ছে তা দেখার জন্য উঠে বসলো সে।

পরক্ষণেই সে শুনতে পেল শোঁশোঁ করে বাতাস বইছে বাইরে। খানিক পরপরই মর্মর করে ডাল ভাঙার শব্দও ভেসে আসছে দূর থেকে। হাওয়ায় জানালার পর্দাগুলো পৎপৎ করে উড়ছে।

জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই দমকা বাতাসের ঝাঁপটা এসে লাগল চন্দ্রার মুখে। বাতাসের সাথে উড়ে এসেছে একরাশ ধুলোবালিও!

সাথে সাথেই চন্দ্রার মনে হলো, কতদিন এই মফস্বলে বৃষ্টি হয়নি! মাঠ-ঘাট সব ফেটে চৌচির হয়ে আছে। ধুলোয় ধূসরিত চারিদিক। একফোঁটা বৃষ্টির অভাব যেন প্রতিটি ধুলিকণাও জানান দিচ্ছে। তাইতো আজ বাতাসের সাথে তাল মিলিয়ে তারাও যেন প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে।

ওদের মতো চন্দ্রাও চায় আজ খুব করে বৃষ্টি নামুক। ভিজিয়ে দিক ধুলোয় ধূসরিত পথ-ঘাট। রুক্ষ ভূমির বুকে ফিরে আসুক সজীবতা।

যদিও সে জানে তার মতো এমন তুচ্ছ একজনের কথা শোনার জন্য প্রকৃতির দায় পড়েনি। এই জগতে তার ইচ্ছার মূল্য কেউ দিবে না।

কাজে যাওয়ার সময় সেদিন মাহমুদকেও চন্দ্রা বলেছিল যেন তাড়াতাড়ি ফিরে আসে। কেননা ঐদিন ছিল চন্দ্রার জন্মদিন। কথা ছিল মাহমুদ ফিরলে তারা দুজন মিলে ঘুরতে যাবে হাতিরঝিল। মাহমুদও দু'হাতে চন্দ্রার মুখটা ধরে কপালে চুমু এঁকে বলেছিল, "আমি খুব তাড়াতাড়িই ফিরে আসবো।"

সেদিন কত আশায় বসেছিল চন্দ্রা! কিন্তু দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়,তারপর রাত। তবুও মাহমুদ ফিরল না। অবশেষে মাঝরাতে কেউ একজন ফোন করে বললো, "মাহমুদ আর কোনদিনও ফিরবে না। চিরকালের জন্য সে চলে গেছে না ফেরার দেশে..."

মাহমুদের কথা মনে হতেই চন্দ্রার চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো। চোখের কোণে দু’ফোঁটা অশ্রু জমে টলমল করছে।

আবারও বাতাসের ঝাঁপটা মুখে লাগতেই ঘোর কাটল চন্দ্রার। দ্রুত আঁচল দিয়ে চোখ মুছে নিয়ে জানালার পাল্লা দুটো টেনে ছিটকিনি লাগিয়ে দিলো। তারপর ছুটে গেল সদর দরজার দিকে। সকালবেলা কাপড় শুকাতে দিয়েছিল আঙিনায়। চটপট সেগুলো গুটিয়ে নিয়ে আলনায় জড়ো করলো।

পুনরায় বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই চন্দ্রার চোখে পড়ল একঝাঁক ছেলেমেয়ে ভিড় জমিয়েছে আমনদের বড় আমগাছটার নিচে। বিক্ষিপ্তভাবে ছুটোছুটি করে আম কুড়চ্ছে তারা। সহসা বাতাসে মটমট শব্দ করে উঠলো গাছের মগডালটা,যেন এক্ষুণি ভেঙে পড়বে!

কিন্তু তাতেও ভাবান্তর নেই ছেলেদের চোখে। নির্বিঘ্নে আম কুড়িয়ে যাচ্ছে তারা।

ভাবলেশহীনভাবে সেদিকেই চেয়ে রইলো চন্দ্রা। ডুবে গেল অতীতের স্মৃতির পাতায়...

মাহমুদ বেঁচে থাকতে অনেকবারই আমনদের গাছটা থেকে আম পেরে নিয়ে এসেছিল চন্দ্রার জন্য। বলতেই হয় এমন আমের জুড়ি মেলা ভার। যে একবার এই গাছের আম খেয়েছে সেই আজীবন এর গুণকীর্তন করতে বাধ্য! তার জন্যই আমের দিনে সামান্য একটু বাতাস হলেই ছেলে-বুড়ো সবাই ভিড় করে গাছতলায়। যেন প্রতিদ্বন্দিতা চলে কার আগে কে আম কুড়তে পারে! মাহমুদ থাকলে আজও নিশ্চয়ই চন্দ্রার জন্য গুটিকয়েক আমি নিয়ে আসত।

.

.

ভাবান্তর ঘটতেই চন্দ্রার খেয়াল হলো ইতিমধ্যেই সন্ধ্যে হয়ে এসেছে! আবছা অন্ধকার ছেয়ে আছে দিগন্তজুড়ে। তৎক্ষণাৎ মনে পড়ল ঘরে তো আলো দেওয়া হয়নি! দ্রুতপায়ে বারান্দা ছেড়ে ভেতরের কক্ষে প্রবেশ করলো চন্দ্রা। একটা তেলের বাতি জ্বালিয়ে চৌকির পাশে রাখল সেটা। তারপর সদর দরজায় খিল লাগিয়ে চলে গেল রান্নাঘরে। রাতের খাবার তৈরি করা হয়নি এখনও। অনেক কাজ বাকি।

দুই.

সন্ধ্যের পর থেকেই শুরু হয়েছে একটানা বর্ষণ। কখনও মুষলধারে আবার কখনও ইলশেগুঁড়ি। সেই সাথে থেমে থেমে মেঘের গুরুগম্ভীর ডাক।

হঠাৎ অদূরেই কোথাও গগনবিদারী বজ্রপাতের শব্দে কেঁপে উঠলো চন্দ্রার গা।

চৌকিতে হেলান দিয়ে বসেছিল সে। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে চৌকি ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল উত্তরের জানালাটার দিকে। দু'হাতে আলতো করে জানালার পর্দাগুলো সরিয়ে বাইরের দিকে এক নজর তাকাল।

ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে। টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে অদ্ভুত এক ধরণের শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি করছে।

বৃষ্টির সময় ঘুম না আসলে প্রায় রাতেই চন্দ্রা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি পড়া দেখত। কখনো কখনো দু'হাত বাড়িয়ে ছোঁয়ার চেষ্টা করত বৃষ্টির ফোঁটা। মাহমুদও তখন চন্দ্রার পাশে এসে দাঁড়াত। তেমনই একদিন চন্দ্রাকে জড়িয়ে ধরে মাহমুদ জিজ্ঞাসু সুরে বলেছিল, "জানো চন্দ্রা,প্রকৃতিরও আমাদের মতো অনুভূতিশক্তি আছে। আছে তা প্রকাশ করার ভাষাও!"

তখন সন্দেহের চোখে মাহমুদের দিকে তাকিয়েছিল চন্দ্রা, "কীভাবে বুঝলে তুমি?"

মাহমুদ মুচকি হেসে বলেছিল - সেটা যেকেউ বুঝতে পারে না। প্রকৃতিকে যে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে কেবল তার কাছেই প্রকৃতির ভাষাটা বোধগম্য হবে।

- ওহ...তাহলে প্রকৃতি তার অনুভূতি প্রকাশ করে কীভাবে?

- যখন প্রকৃতিতে ফুল ফোটে,বিলের জলে শাপলারা খেলা করে,স্নিগ্ধ সকালে কচি ঘাসের ডগা বেয়ে শিশিরবিন্দু টপটপ করে ঝরে পড়ে,ভোরের সোনালী আলো যখন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠে তখনই বুঝবে প্রকৃতি হাসছে!

- আর প্রকৃতি কান্না করে কখন?

মাহমুদ তখন আঙুল দিয়ে জানালার বাইরে দেখিয়ে বলেছিল - যখন এমনি করে মুষলধারে বৃষ্টি হয়!

ফ্যাকাশে মুখে চন্দ্রা জিজ্ঞেস করেছিল - কিন্তু প্রকৃতি কান্না করে কেন? তার কিসের দুঃখ?

প্রত্যুত্তরে মাহমুদ কেবল বলেছিল, "সেটা তুমি এখন বুঝবে না। সময় হলে ঠিকই বুঝতে পারবে।"

কপট রাগে তখন চন্দ্রা মুখ ঘুরিয়ে জানালার দিকে ফিরে ছিল। যেন বুঝিয়ে দিত চাইলো, মাহমুদের সাথে আর একটি কথাও বলতে চায় না সে...

আজও একইভাবে জানালাটার দিকে তাকিয়ে আছে চন্দ্রা। আজও আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে প্রকৃতির বুকে। তবে পার্থক্য কেবল একটাই। আজ মাহমুদ দাঁড়িয়ে নেই চন্দ্রার পাশে।

মাহমুদ চলে গেছে আজ ছ'মাস হলো। তার শূণ্যতা প্রতিনিয়ত চন্দ্রাকে মনে করিয়ে দেয়, এই মুহূর্তে সে কতখানি একা! মাহমুদ থাকতে চন্দ্রাকে কখনোই কোনকিছু নিয়ে ভাবতে হয়নি। বিয়ের পর থেকেই অভাব জিনিসটা চন্দ্রাকে কখনো বুঝতেই দেয়নি মাহমুদ। কিন্তু আজ মাহমুদের অভাবটা খুব করে বুঝতে পারছে চন্দ্রা। মাহমুদের অনাগত সন্তানের পুরো দায়িত্বটা এখন তার কাঁধে এসে পড়েছে।

চন্দ্রা দেখেছে অন্তঃসত্ত্বা মেয়েরা প্রায় সময়ই তাদের বাপের বাড়ি গিয়ে থাকে, যাতে তাদের যত্নআত্তির কোনো কমতি না হয়। কিন্তু চন্দ্রার সেই উপায়ও নেই। জন্মের পর থেকেই অনাথ আশ্রমে বেড়ে উঠেছিল সে। তার বাবা-মা কে,আদৌ তারা বেঁচে আছে না মারা গেছে তার কিছুই জানে না চন্দ্রা।

বিয়ের আগে অনাথ আশ্রম আর বিয়ের পর মাহমুদের ছোট্ট বাড়িটা ছাড়া চন্দ্রার আর কোনো ঠিকানা নেই। প্রতিনিয়ত চন্দ্রার মনে হচ্ছে দুনিয়াটা যেন ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসছে তার জন্য। অথচ মাহমুদ থাকতে তার মনে হতো পৃথিবীটা স্বর্গের চাইতেও বেশি সুখের। কিন্তু আজ সে উপলব্ধি করতে পারছে, এই জীবনসংগ্রামে একা একটি নারীর পক্ষে প্রতিনিয়ত লড়াই করে টিকে থাকা কতখানি কঠিন!

চন্দ্রা অবশ্য চাইলেই অন্য কারো হাত ধরে নতুন আরেকটি জীবন শুরু করতে পারত। এখনও তার উঠতি যৌবন।

তবে চন্দ্রা যদি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতো তাতে মাহমুদ এবং তার অনাগত সন্তানের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তো। আর যাই হোক কোনো পুরুষই অন্যের সন্তানকে নিজের বলে পরিচয় দিতে চাইবে না নিশ্চয়ই?

আর চন্দ্রাও কখনোই মাহমুদের রেখে যাওয়া আমানতের অমর্যাদা করতে পারবে না। তার কাছে নতুন আরেকটি জীবন শুরু করার চাইতে মাহমুদের ভালোবাসার মূল্য অনেক বেশি। নতুন আরেকটি পরিচয়ের চাইতে মাহমুদের দেওয়া চন্দ্রাবতী নামটাই তার কাছে অধিক প্রিয়।

চন্দ্রা জানে মাহমুদ যেখানেই থাকুক,সে এখনও তাকে ভালোবাসে...ঠিক আগের মতোই! হয়তো জানালার ওপাশেই দাঁড়িয়ে আছে সে। স্নেহভরা চোখে তাকিয়ে আছে চন্দ্রার মুখপানে।

সমাপ্ত...

------------------------------------

লেখা: জোবায়েদ হোসেন

Tags:

About author
আমি গল্প এবং বই প্রেমিক একজন মানুষ। গল্প এবং বই পড়তে খুবই ভালোবাসি। যেখানেই যে গল্প অথবা কাহিনী খুজে পাই সেগুলো সংগ্রহ করি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি। আমি নিজেও কয়েকটি গল্প লিখেছি তবে সেগুলোর সংখ্যাটা খুবই সামান্য।