গল্পঃ সৎমা

  • Share this:

আমার মা মারা যায় আমার বয়স তখন মাত্র তিন। মায়ের মুখ আমার মনে নেই, মনে থাকার কথাও না।সত্যি কথা বলতে আমার মা যে মারা গেছে এটাই আমি জানতাম না। আমার সৎমা কেই আমি নিজের মা হিসেবে জানতাম।এমন কি আমার স্কুলের সার্টিফিকেটেও মায়ের নামের জায়গায় আমার সৎমায়ের নাম ছিল।তার কোন আচরণেই আমার কখনো মনে হয়নি উনি আমার সৎমা। আমার মায়ের আমি ছিলাম একমাত্র ছেলে।আমার সৎ মায়ের দুই ছেলে মেয়ে। আমার সৎমা তার নিজের ছেলেমেয়ে কে যেমন ভালোবাসতো আমাকেও তেমনি ভালোবাসতো। আড়ালে লোকে কি বলত জানিনা তবে আমি কখনো আমার সামনে কাউকে বলতেও শুনিনি আমার মা নেই।

আমি যখন জানতে পারলাম আমার মা নেই তখন আমার বয়স চৌদ্দ বছর।একদিন পাড়ার এক সহপাঠির সাথে ফুটবল খেলা নিয়ে ঝামেলায় আমি ছেলেটির গায়ে হাত তুলেছিলাম।ছেলেটির বাবা আমাকে যা-তা বলে গালি-গালাজ করল, বাপ যেমন গুন্ডা ছেলে ও তেমন হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। আমি তেড়ে গেলাম লোকটার দিকে, খবরদার বাপ তুলে কথা বলবেন না। আমি দোষ করেছি আমাকে বলুন।লোকটা তখনও বকেই চলেছে, তোর বাপ খুনি তোর মাকে খুন করেছে, তুইও সেই রাস্তায় হাটছিস।আমি ভাবলাম, পাগল নাকি লোকটা কি উল্টাপাল্টা কথা বলছে।

বাসায় ফিরলাম। বাবা ডাক দিয়ে বলল, এদিকে আয়। পড়াশোনা বাদ দিয়ে কি শুরু করেছিস।কাশেমের ছেলেকে মেরেছিস কেন? আমি বললাম বাবা তুমি জানো কাশেম লোকটা কি মিথ্যুক! আজ মাঠে সবার সামনে আমাকে যা তা বলে গালি দিয়েছে।বলেছে তোর বাপ খুনি তোর মাকে মেরেছে।আমার মনে হলো বাবা কিছুক্ষণের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর আমাকে ধমক দিয়ে বলল, ফুটবলের মাঠে যেন তোমাকে আর না দেখি।আমি অবাক হয়ে গেলাম বাবা কাশেম লোকটা কে কিছুই বললনা।

আমি মায়ের কাছে গেলাম, মা উনি বাবাকে খুনি বলল বাবা কিছু বলল না কেন।বাবা নাকি আমার মাকে খুন করেছে। তাহলে তুমি কি আমার মা নও।আমার কথা মা হেসে উড়িয়ে দিল ধুর পাগল কে কি বলল ওসব গায়ে মাখতে আছে?হাত মুখ ধুয়ে আয় আমি তোর খাবার দিচ্ছি। আমি বুঝলাম মা আমায় এড়িয়ে যাচ্ছেন।

মায়ের কথাও আমার বিশ্বাস হলোনা। আমি দাদির কাছে গেলাম,দাদি আর সংকোচ করলনা।আমাকে সব কিছু খুলে বললেন। আমার বয়স তখন তিন আমার মা তখন দ্বিতীয় সন্তান সম্ভবা।বাবার সাথে কি একটা বিষয় নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল মায়ের। রাগের মাথায় বাবা মাকে ধাক্কা দিয়েছিলেন, অসাবধানতা বসত মা পড়ে গিয়েছিল মেঝেতে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়ে মা আর মায়ের অনাগত সন্তান দুজনই মারা যায়। কিন্তু এটা নাকি নিছক দুর্ঘটনা ছিল, বাবা ইচ্ছা করে মাকে ফেলে দেয়নি। বাবা নাকি মাকে খুব ভালোবাসতেন।মায়ের মৃত্যুর পর আমার জন্যই বাবা আবার বিয়ে করেন।

দাদির কাছে সবকিছু শোনার পর আমি আর ঠিক থাকতে পারিনি।বাবার প্রতি প্রচন্ড রাগ হয়েছিল, সবচেয়ে বেশি অভিমান হয়েছিল আমার সৎমায়ের প্রতি।সে কেন আমাকে বলেনি সে আমার নিজের মা নয়। অথচ এমন অভিনয় করে যেনো আমাকে তার ছেলেমেয়ের থেকে বেশি ভালোবাসে।

সৎমা যে কখনো ভালো হতে পারেনা,এরকম একটা ধারনা আমার মধ্যে সবসময়ই ছিল।আমি যখন ক্লাস ফাইভে পড়ি তখন আমার এক বন্ধুর মা মারা যায়, কিছুদিন পরে ওর বাবা আবার বিয়ে করে।কিন্তু নতুন মায়ের অত্যাচারে ছেলেটার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়।মাঝে মাঝেই সে ক্লাসে বসে কাঁদত, নোংরা পোশাক পড়ে স্কুলে আসতো, ঠিকমতো লেখাপড়া করত না। একদিন খেলার সময় আমি ওর পিঠের উপর আঁকাবাঁকা দাগ দেখে শিউরে উঠেছিলাম। পড়ে শুনেছিলাম এসব নাকি ওর সৎমায়ের অত্যাচার।কিন্তু আমার সাথে কখনো এরকম হয়েছে বলে আমার মনে পরেনা।

এতোকিছুর পড়েও আমি নিজেকে বোঝাতে পারলাম না।মায়ের ভালো আচরণেও আমি খারাপ দিক খুজতে শুরু করলাম।মা আমার আগে আমার ছোট ভাইদের খাওয়ার জন্য ডাকলে আমার মনে হতো আমি সৎ ছেলে তাই আমাকে আগে ডাকেনা।আবার খাওয়ার সময় আমার পাতে মাছের বড় মাথাটা তুলে দিলে ও ভাবতাম, আদিখ্যেতা! আমার মা নেই জন্য আমাকে করুণা করা হচ্ছে।

একসময় আমি মায়ের সাথে খুব খারাপ ব্যাবহার করতে শুরু করলাম। আর বাবার সাথেতো কথাই বলতাম না।ছোট ভাইবোন দের গায়ে হাত তুলতাম।রাতে বাড়ি ফিরতাম অনেক দেরি করে।ঠিকমতো স্কুলে যেতাম না, পড়াশোনা করতাম না।শিক্ষকরা যেহেতু আমাকে ভালো ছাত্র বলে জানত, আমার পড়াশোনার বেহাল দশা দেখে তারা বাবাকে জানাল।আমি সেবার পরীক্ষায় খুব বাজে রেজাল্ট করলাম।বাবার সাথে দেখা হতোনা অনেকদিন।সকালে বাসা থেকে বের হতাম বাবা ঘুমানোর পড়ে বাড়ি ফিরতাম। কিন্তু মা বসে থাকতো খাবার নিয়ে।

একদিন অনেক রাত করে বাড়ি ফিরেছি, অন্যদিনের থেকেও অনেক বেশি রাত।কেউ জেগে থাকবেনা সেটাই স্বাভাবিক।বাড়িতে ঢুকেই দেখলাম মা বারান্দায় বসে আছে।মা আমাকে দেখেই ছুটে এলেন,কোথায় ছিলি তোর বাবা আজ সারাদিন তোর ঘরে বসে আছে।ঘরে ঢুকে দেখলাম, সত্যি বাবা বসে আছে।বাবার চোখ জবা ফুলের মতো টকটকে লাল, হাতে মোটা একটা লাঠি।বাবা দরজা আটকিয়ে দিলেন, আমাকে জিজ্ঞেসও করলেন না এতো রাত পর্যন্ত আমি কোথায় ছিলাম। লাঠিটা হাতে নিয়ে এলোপাথাড়ি মার শুরু করলেন। বাবা অসুস্থ মানুষ বাবার গায়ে অতো জোর ছিলনা।আমি বাবাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলাম, পাশে আমার ক্রিকেট ব্যাটটা ছিল।আমি গুনে গুনে বাবার মাথায় তিনটে আঘাত করলাম।বাবা নিস্তেজ হয়ে পড়ে গেল।আমি তখনও রাগে কাপছি। মায়ের দরজা ধাক্কানোতে আমি সম্বিত ফিরে পেলাম। এ আমি কি করলাম!

আমি দরজা খুলে মাকে বললাম, মা আমি মনে হয় বাবাকে মেরে ফেলেছি।মা আমার কথা শুনে চিৎকার করলেন না কাদলেন ও না শুধু আমার হাত ধরে বললেন বাবা তুই পালিয়ে যা।আর কখনো এখানে আসিস না।আমি সেদিন রাতেই পালিয়ে এসেছিলাম।তারপর কি হয়েছিল আমি জানিনা।আমার সৎমা কিভাবে তার সৎ ছেলেকে বাচিয়েছিলেন কিছুই না। আমার সৎমা আমাকে কি পরিমানে ভালোবাসতেন সেদিন আমি বুঝলাম। সেদিনের পর আমি আর কখনো গ্রামে ফিরিনি। আমাকেও হয়তো কেউ খোজেনি।

মাঝে মাঝেই আমি ঘুমের মধ্যে মা মা করে কেঁদে উঠি। আমার স্ত্রী উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে । আমি বলি, মাকে খুব মনে পড়ছে।সে পরম মমতায় আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। নিজের মায়ের মুখটা আমার মনে পড়েনা, কিন্তু সৎ মায়ের মুখটা আমি একদিনের জন্যও ভুলতে পারিনি।

 

লেখাঃ ইশরাত ইশা

Tags:

About author
আমি গল্প এবং বই প্রেমিক একজন মানুষ। গল্প এবং বই পড়তে খুবই ভালোবাসি। যেখানেই যে গল্প অথবা কাহিনী খুজে পাই সেগুলো সংগ্রহ করি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি। আমি নিজেও কয়েকটি গল্প লিখেছি তবে সেগুলোর সংখ্যাটা খুবই সামান্য।