নিয়তি নয়তো সাফল্য

  • Share this:

বিগত তিন বছরের সম্পর্কের অবসান ঘটতে যাচ্ছে নয়ন এবং পান্নার।

নয়নের বিশ্বাস পান্না তাকে ছাড়া ভালো থাকতে পারবে না। কিন্তু পান্নাকে দেখলে তা একেবারেই বুঝা যায় না। শেষ বারের মতো দেখা করতে এসে পান্নার মুখ একটুও মলিন ছিলো না।

অথচ নয়ন ব্যর্থতার বোঝা নিয়ে পান্নার সামনে কোনরকম বসে আছে।

দুদিন পর পান্নার বিয়ে! পাত্র নাকি বিশাল ইঞ্জিনিয়ার। তাছাড়া পাত্র তার বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। বিশাল সম্পত্তি বাড়ি গাড়ি সবই আছে।

এমন ভালো ঘরে বিয়ে হচ্ছে পান্নার!

মুখ মলিন না হওয়ারই কথা।

এদিকে চাকরির খুঁজে আর প্রিয়তমা হারানোর বিরহে । মুখে ব্যর্থতার ছাপ নিয়ে চুপচাপ বসে আছে নয়ন। নয়ন ভিতরে ভিতরে পুড়ছে। সে জানে এ দেখাই তাদের শেষ দেখা। এরপর হয়তো আর কোনদিন এভাবে কোন রেষ্টুরেন্টের যুগলবন্দী কক্ষে বসে পান্নার হাত ধরে কোনদিন বলতে পারবে না আমাকে ছেড়ে যেও না।আজ সবকিছু ঠিক না থাকলেও নয়নের বলতে ইচ্ছে হচ্ছে আমাকে ছেড়ে যেও না।

কিন্তু বর্তমানে সেই সাহসও নয়নের নাই। পান্নাকে সারাজীবন নিজের করে রাখার সামর্থ্য বা শক্তিটুকুও নাই, সময়-পরিস্থিতির কাছে হার মেনেছে সে।

পান্নাকে যেতে দিতে মন চাইছে না। তবুও যেতে দিতে হচ্ছে। পান্না হয়তো বুঝবে না। কিন্তু নয়ন জানে পান্নাকে ছাড়া তার বেচে থাকতে কতটা কষ্ট হবে। সে কতটা একাকী হয়ে যাবে আর কতটা খারাপ অবস্থার মোকাবেলা করতে হবে নয়ন বুঝতে পারছে।

নয়ন পান্নাকে বলে - তোমার কি মনে আছে এই রেষ্টুরেন্টের এই কেবিনটায় প্রথম তোমাকে নিয়ে এসেছিলাম। পান্না বলে হ্যাঁ মনে আছে।

সেদিন তুমি নীল রংয়ের জামা পরেছিলে। আর আমি একটি কাঠগোলাপ নিয়ে তোমার সামনে হাজির হয়েছিলাম।

পান্না মুচকি হাসি দেওয়ার চেষ্টা করলো।

পান্না জানায় এখন আর অতীতের স্মৃতি চারণ করে কি লাভ? আমি এখানে এসেছি তোমার সব স্মৃতি তোমাকে ফিরিয়ে দিতে। আর আমার স্মৃতিগুলো মুছে ফেলতে। এই নাও তোমার দেওয়া কাঠগোলাপ।

( পান্না আসার সময় একটি কাঠগোলাপ কিনে নিয়ে আসে)

তারপর একে একে ফিরিয়ে দেয় নয়নের দেওয়া উপহারগুলো।।

নয়ন নিতে চায় নি। পান্না বলে মন খারাপ করে বসে থাকার মানে নাই। এতোদিনে যদি ছোটখাটোও একটা চাকরির ব্যবস্থা করে আমার পরিবারে বিয়ের প্রস্থাব পাঠাতা তাহলে আমি ঠিকই তোমার হতাম। ভুলেও যাও আমাকে।

নয়ন চুপ ছিলো। চোখে জল ছলছল করছিলো। নয়নের ইচ্ছা হচ্ছিলো পান্নাকে একবার বলুক চলো পালিয়ে যাই। কিন্তু সেই সাহসটুকু এখন তার নাই। আগেও একবার বলেছিলো। কিন্তু পান্না জানায় সে কোন দিন পালিয়ে গিয়ে তার বাবার ইজ্জতে দাগ লাগতে দিবে না।

আর এখন তো পান্নার সামনে সুন্দর একটি জীবন, বড়লোক, সুদর্শন এবং ভালো একটি ছেলের সাথে তার নতুন জীবন শুরু হতে চলছে। এমন অবস্থায় পালানোর কথা সে কিভাবে বলে?

নয়ন নিয়তির কাছে হার মেনেছে। এমন সময় পান্নার ফোনে কল আসে। তার হবু স্বামী তাকে কল দিয়েছে। নয়নের সামনে সে কল রিসিভ করে কথা বলে। হবু স্বামী নাকি এই মুহূর্তে তাকে নিয়ে বিয়ের জন্য কিছু শপিংয়ে যাবে। পান্না নয়নকে বুঝিয়ে শুনিয়ে উঠে। পান্নার শেষ কথা ছিলো আমাকে ভুলে যেও।

নয়ন (স্মৃতি) উপহারগুলো সেদিন রেষ্টুরেন্টের টেবিলেই রেখে চলে আসে। মাস দুয়েক পান্নার জন্য কান্না করেছিলো। পাগলপ্রায় ছিলো। সেদিন পান্না চলে যাওয়ার পর থেকে দুটি মাস ছিলো তার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়। যেই সময়টায় নয়ন মচকে গিয়েছিলো।

এদিকে পান্না নয়নের সামনে স্বাভাবিক থাকলেও, সেদিন বাসায় গিয়ে নয়নের জন্য প্রচুর কেঁদেছিলো। কিন্তু পান্না চায় না তার জন্য তার বাবার ইজ্জত নষ্ট হোক তাই সে পালায় নি।

বাবা মায়ের খুশির জন্য নিজের ভালোবাসা, স্বপ্ন, ইচ্ছে সবটুকুই সে বিসর্জন দিয়েছে। বিয়ের পরও নয়নের কথা ভেবে সে কান্না করে। তার ইঞ্জিনিয়ার স্বামী মুহসিন তাকে যথেষ্ট ভালোবাসে। পান্নাকে খুশি রাখার জন্য যথেষ্ট ভালোবাসা, সম্মান, উপহার এমনকি পান্নার সব চাহিদাটুকুও পূর্ণ করে। কিন্তু আদৌ কি পান্না দামী দামী উপহার, মুহসিনের ভালোবাসা বা মুহসিন তাকে খুশি রাখার জন্য যা যা করেছে সবকিছুতে সে খুশি হয়েছে? নাকি এখনো নয়নের জন্য তার মন কাঁদে?

পাঁচ বছর কেটে যায়।

মুহসিন তার জায়গায় কিছুটা স্বার্থক। সে উদাসীন পান্নাকে এখন হাসিখুশি দেখতে পায়৷ দুবছরের একটি সন্তান নিয়ে পান্না যথেষ্ট সুখে আছে। অর্থ,বিত্ত,যশ সবই আছে এখন। নয়নের কথা মাঝে মাঝে মনে হলে মন খারাপ হয়। তবে খুব বেশি মনে পড়ে না। মাঝে মাঝে মনে হয়। নয়ন নাম শুনলে কিংবা নয়নের মতো কাউকে দেখলে।

প্রথম প্রথম পান্না মুহসিনকে ফাঁকি দিয়ে নয়নের খুঁজ নিতে চাইতো। কিন্তু নয়নের ফোন বন্ধ থাকতো। কারও কাছ থেকে জানতে চাইলে কেউই নয়নের কোন খুঁজ খবর দিতো না।৷ এই ৫ বছরে নয়ন সম্পর্কে এক বিন্দুও কিছু জানা হয় নি পান্নার। তবে তার খুব ইচ্ছা ছিলো নয়ন ভালো আছে কি না জানার?

বিকালে মুহসিন বাসায় আসে। হাতে কি যেনো উপহার। পান্না বলে কি ব্যাপার তুমি আজও আমার জন্য উপহার নিয়ে এসেছো? তোমার তাহলে মনে আছে আজ আমাদের বিবাহ বার্ষিকী? মুহসিন দাঁত কামড়িয়ে বলে সরি আমার মনেই ছিলো না আজকের কথা। আসলে উপহারটাও তোমার জন্য না। আজ সন্ধ্যায় আমার বসের বিয়ে। নতুন যে কোম্পানিতে জয়েন করেছি সেই কোম্পানির বস।

তুমি রেডি হও বস বলেছেন সবাই যেনো ফ্যামিলিসহ উপস্থিত থাকে। পান্না মন খারাপ করে। মুহসিন এসে সরি বলে। আর জানায় আর কোনদিন এমন ভুল করবে না। তারপর পান্নাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে নিয়ে যায় বিয়ের অনুষ্ঠানে।

মুহসিন তার স্ত্রী পান্নাকে পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলো- সে যেই অফিসে দেড়লক্ষ টাকা বেতনে চাকরি করে সে অফিসের মালিক ও চেয়ারম্যান মিষ্টার নয়ন আহমেদের সাথে।

পান্না নয়নকে দেখে অবাক!

পান্না উপলব্ধি করতে পারলো সবার দিন সমান যায় না। আর কিছুকিছু ছেলে চাকরি হয় না কেন চাকরি হয় না কেন শুনে চুপচাপ থাকে কেন?

সমাজ এবং আপনজনের বিষমাখা কথা গুলোও হজম করে বেচে থাকে কেন?

আসলে নয়নের মতো ছেলে চাকরি করতে চায় না। চাকরি দিতে চায়। উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নে তারা অনেক কিছু সহে যায়।

নয়ন পান্নার মুখের দিকে চেয়ে চিন্তা করে তার কাঠানো বিগত ৫টি বছরের পরিশ্রম, ভেঙে গিয়ে আবার গড়ে ওঠা ও আজকের সাফল্যের কথা।

তাদের এই অবস্থাকে কেউ নিয়তির বিচার বলবে আর কেউবা বলবে এটা নয়নের সাফল্যেরও সাফল্যতা।

(সমাপ্ত)

অনুগল্প- নিয়তি নয়তো সাফল্য (কাল্পনিক)

Tags:

About author
আমি গল্প এবং বই প্রেমিক একজন মানুষ। গল্প এবং বই পড়তে খুবই ভালোবাসি। যেখানেই যে গল্প অথবা কাহিনী খুজে পাই সেগুলো সংগ্রহ করি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি। আমি নিজেও কয়েকটি গল্প লিখেছি তবে সেগুলোর সংখ্যাটা খুবই সামান্য।