অনুগল্পঃ সময়েরই ঝড়া পাতা

  • Share this:

মা তুমি এই বয়সে প্রেগন্যান্ট! বেপারটা ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারছো। আমার বউ ওও প্রেগন্যান্ট আজ তিনমাস হলো আর তুমি বলছো এখোন তুমিও মা হবা।এটা যদি পাড়া প্রতিবেশি জানে আমাদের তো আর কোথাও সম্মান থাকবে না।মানুষকে তো আমি মুখ দেখাতে পারবো না।(সানি)

----হে মা তোমরা এটা ঠিক করোনি, এই সময়ে এই ভুলটা করে তোমরা আমাদের ভাই বোনের মাথা নিচু করে দিয়েছো সবার সামনে। এখোন কারো সাথে মুখ খোলে আর দুটো কথা বলতে পারবো না।(সাথি)

-----হুম তাই আমি আর তোমার বউমা মিলে ডিসিশন নিয়েছি আমরা এখানে আর থাকবো না।আমরা আলাদা হয়ে যাবো। আমি মানুষের মুখের কথা শুনতে পারবো না।আমি কালকেই আমাদের নতুন একটা ফ্লাট কিনে রেখেছিলাম সেখানে উঠে জাবো।থাকো তোমরা তোমাদের অনাগত বাচ্চা নিয়ে।(সানি)

----আমিও আর কোনদিন আসবো না তোমাদের এখানে।তোমাদের এখানে আসলেই লোকে এটা সেটা জিজ্ঞেস করবে আমি ওসব বলতে পারবো না এখোন। আমরাও আর আসছি না।তুমি এখোন বাচ্চাটাকে নষ্ট করে ফেললেওতো পারো।দরকার কি এটাকে রাখার?(সাথি)

নিজের বড় ছেলে সানি আর ছোট মেয়ে সাথির মুখে এসব কথা শুনে নিরবে চোখের পানি ফেলছি আমি আর আমার স্বামী। ছেলে মেয়েদের এসব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের হয়তো নেই তাইতো সবটা মুখ বুঝে সয্য করে নিরবে পানি ফেলছি।

আমি রোজিনা বেগম, আমার স্বামী মাহমুদ। আমার একটা ছেলে আরেকটা মেয়ে আছে।ছেলের বিয়ে হয়েছে বছর খানেক আজ তিনমাস জাবত আমার বউমা প্রেগন্যান্ট। আর আমার মেয়ের বিয়ে হয়েছে ৫বছর হয়ে গেছে।একটা ছেলে আর মেয়েও আছে ওর। আমার নাতি নাতনি আছে। আমাদেরি একটা ভুলে আমি একটা বেবি কনসিভ করে ফেলি।নিজের কাছেই খারাপ লাগছে যে এই বয়সে এটা ঠিক হয়নি।কিন্তু জীবন তো আল্লাহর দান আমরা কি করতে পারি।এভাবে বেবিটাকে নষ্ট করে ফেলবো।না এটা হতে পারে না আমি পারবো না নিজ হাতে একটা প্রানকে মেরে ফেলতে।আমার এই অনাগত বাচ্চাকে আমি নষ্ট করবো না।ও আমার মধ্যেই বড় হবে।

তোদেরকে জদি পৃথিবীতে আনতে কষ্ট করতে পারি তাহলে এই বাচ্চাটাকে কেন নয়। এই বাচ্চাটার কি দোষ, সেতো কোন দোষ করেনি। তাই তোদেরও আমি যেইভাবে জন্ম দিয়েছি ওকেও আমি দিবো।তোদের এখান থেকে চলে জাওয়ার হলে যেতে পারিস।আমি তোদের আটকে রাখবো না।চাইলে আজকেই চলে যেতে পারিস।

বলেই আমি আসতে আসতে হেটে রুমে চলে এলাম এসে সুয়ে সুয়ে কান্না করছি। ছেলেমেয়েদের ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে।কতোটা কষ্ট করেছি ওদের বড় করতে আর আজ কিনা এই বেপরাট নিয়ে ওরা এতোটা হাইপার হচ্ছে। মানুষ কি বলবে? কি ভাববে এটা নিয়ে ওরা বাচ্চাটাকে নষ্ট করে ফেলতে বলছে। কিভাবে পারলো এটা বলতে কিভাবে??ওদেরকে আমি বড় করেছি শিক্ষা দিয়েছি এসব করতে।ওরাও যেমন আমার সন্তান আমার পেটেও যে আছে সেও আমার সন্তান ওদেরকে পৃথিবীতে আনতে পারলে ও কি দোষ করেছে। নাহ্ আমি আর কাদবো না,এসব ছেলে মেয়েদের জন্য কেদে কি লাভ দরকার আছে কষ্ট পেয়ে।

চোখের পানি মুছে বারেন্দায় দাঁড়িয়ে আছি দেখতে পেলাম একে একে আমার ছেলে মেয়ে বউমা নাতি নাতনিরা সবাই বাসা ছেরে চলে গেলো।এটা দেখে কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আজ একজনকে প্রান দিতে গিয়ে আর দুইজনকে নিজের থেকে আলাদা করে দিলাম।বুকটা আজ বড্ড খালি হয়ে গেলো।জতোই হোক ওরাওতো আমার সন্তান।

দেখতে দেখতে সময় কাটতে লাগলো, আরো ৪টা মাস চলে গেলো পেটটা আরো উচু হতে লাগলো চলা ফেরা একটু কষ্ট হচ্ছে। আমার স্বামীতো আর চাকরি করে না এখোন রিটায়ার্ড পারসোন,পেনশনের টাকা দিয়েই দুইজনের চলে যাচ্ছে। ওনিও সারাদিন ঘরেই থাকেন আমাদের দেখাশুনা করেন। আমার যখোন যেটা লাগে সেটা সামনে এনে হাজির করেন।

একদিন বাসায় ভালো লাগছিলো না তাই আমি আর আমার স্বামী রাতের বেলা বাহিরে গেলাম একটু মনটা ফ্রেশ করার জন্য। উনি আমাকে একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলেন সেখানে গিয়ে বসে আছি।

ঠিক আমার সামনের টেবিলে দেখতে পেলাম আমার ছেলে আর বউমা বসে আছে।কতোগুলো দিন পর ওদের দেখলাম ইচ্ছে করছে দুটোকে জড়িয়ে ধরি। কিন্তু সেই ক্ষমতা আমার আর নেই এখোন।

হঠাৎ দেখলাম আমার ছেলে আমাকে দেখতে পেয়েছে তাই হাতটা উঠাতেই ও আমার থেকে মুখটা ফিরিয়ে ওর বউকে নিয়ে চলে যেতে লাগলো।আমার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পরতে লাগলো।

আমার স্বামী আমার চোখের পানি মুছে দিয়ে খাবার মুখে দিয়ে বললো,

----কান্না করো না,আমাদের কপালে যা ছিলো তাই হয়েছে।যাই করুক না কেন ছেলেটাতো আমাদেরি।বাচ্চা মানুষ ভুল করতেই পারে।ওদের কথায় কষ্ট পেলে চলবে।দেখো আমাদের বাচ্চাটা হলে ঠিক চলে আসবে দেখা করতে নিজের ভাই বা বোনের সাথে দেখা করতে।

আমি আফসোস এর বড় একটা নিশ্বাস ফেলে খাবারটা চিবোতে লাগলাম।ছেলে মেয়ে গুলো রাগ করে যাওয়ার পর থেকে কিছু ভালো লাগে না ঘরটা যেন একদম খালি পরে আছে। বুকটা হাহা কার করে ওদের জন্য।

আরো দুইমাস পর,

পাশের বাসার ভাবি আমাকে দেখে বললেন,

-----কি ভাবি মিষ্টি খাওয়াবেন না?

-----কিসের মিষ্টি ভাবি?

-----ওমা আপনার ছেলের ঘরে ছেলে হয়েছে। আপনি দাদি হয়েছেন সেটার মিষ্টি খাওয়াবেন না বুঝি।

ভাবির মুখ থেকে কথাটা শুনে আনন্দে চোখ দুটো ভরে উঠলো।ওরা যতোই কথা না বলুক আমারিতো সন্তান। ভাবি আমাকে বললেন,

-----কেন আপনাকে বলেনি কিছু।জানি না ভাই আপনার ছেলের সমস্যাটা কি। আপনাদের এই সময়ে এভাবে ফেলে রেখে চলে গেলো।

------নানা আমাকে বলেছে ওরা আসলে আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি আপনার কথাটা

-----ওওও আচ্ছা।

-----আচ্ছা ভাবি খাওয়াবোনি আমি মিষ্টি পরে।আমি এখোন যাই।

-----ঠিক আছে।

আমি বাসায় চলে এলাম, এসে আমার স্বামিকে খবরটা দিলে সেও খুব খুশি হয়।আমি উনার কাছে বায়না ধরলাম নিজের নাতিনকে দেখবো। আমার ছেলের ঘর আলো করে ছেলে এসেছে।তার মুখ দেখতে হবে না।

উনি প্রথমে রাজি হলেন না তাও ওনেক বুঝিয়ে চলে গেলাম খোজ নিয়ে কোন হসপিটালে আছে ওরা সেখানে।

হসপিটালে ওদের কেবিনে যেতেই দেখি বউমা শুয়ে আছে আমাকে দেখে বললো,

-----আম্মা আপনি আসেন বসেন।

----;হুম কেমন আছো তুমি এখোন।

-----ভালো।

আমি গিয়ে ওর পাশে বসতেই ও ওর ছেলেকে আমার কোলে তুলে দিলো।আমি বাবুর গলায় সর্নের একটা চেন পরিয়ে দিলাম। দিয়ে আদোর করতে লাগলাম।

কিছু সময় পর আমার ছেলে কেবিনে ঢুকে আমাকে দেখে বললো,

-----কি বেপার মা বাবা তোমরা এখানে?

-----তোর বাবুকে দেখতে এসেছিলাম।আর কেমন পাশানরে তুই একবার ফোন করে জানালিও না।এটাকি ঠিক হয়েছে?

-----ফোন দিয়ে জানাইনি নিশ্চয়ই তোমদের এখানে আনতে চাইছিলাম না।তাও তোমরা সেই এখানে এসেই গেলে।তোমাদের লজ্জা লাগলো না এভাবে এখানে আসতে।

-----সানি ঠিক ভাবে কথা বল ও তোর মা হয়।তোদের এতো কষ্ট করে খেটে বড় করেছি এসব কথা শোনার জন্য। ইচ্ছে করছে তোকে আমি এখানেই মেরে ফেলি।

আমি আমার স্বামীকে শান্ত করে ওখান থেকে বেরিয়ে এলাম। নিরবে চোখের পানি ফেলে নিজের কষ্টটাকে দমিয়ে রাখছি।কেমন সার্থপর হয়ে গেছে আমার ছেলেটা।ওতো এরকম ছিলো না।ওরাতো আগে আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝতো আর এখোন কি এমন হয়ে গেলো যে ওরা আমাকে অপমান করতেও দুইবার ভাে না।শুধু মাএই কি আমাদের এই পেটের সন্তান এর জন্য। এখোন মনে হচ্ছে ওকে পৃথিবীতে না আনতে চাইলেই হতো।এবোরশন করিয়ে ফেললেই ভালো হতো।

ডুকরে ডুকরে জীবন চলছে আমার।এদিকে আমার ডেলিবারির সময় হয়ে গেছে। বয়সটা একটু বেশি হওয়ায় শরীর যেনো আর চলছে না। হসপিটালে বসে আছি ডাক্তার যাওয়ার সময় বলে গেছে রক্তের প্রয়োজন হবে দুই বেগ। এক বেগ নাকি হসপিটালে ব্লাড ব্যংকে আছে আরেক ব্যাগ লাগবে।

রক্ত কোথায় পাবো এখোন??আমার আর আমার ছেলের মেয়ের দুইজনের সাথেই রক্তের মিল আছে তাই ওদের দুইজনকেই বললো রক্তের কথা আমার স্বামি

দুইজনেই না করে দিলো আসতে পারবে না।

ওটিতে নিয়ে জাওয়া হলো আমাকে ভিতরে ঢুকার সময় একটা মুচকি হাসি দিয়ে চলে গেলাম।বিগত তিন ঘন্টা অপারেশন এর পর আমাকে নেওয়া হলো বেডে। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাচ্ছি।সব কিছুই কেমন ঝাপসা দেখতে পারছি।চোখ গুলো মেলে রাখতে খুব কষ্ট লাগছে।

তাও খুললাম দেখলাম আমার স্বামী সামনে বসে আছে,আমি ওকে জিগ্যেস করলাম,

-----আমাদের বাচ্চাটা???

উনি মাথা নারিয়ে নেই বললেন,এতেই বুঝে গেলাম আমাদের বাচ্চটা আর নেই মারা গিয়েছে। আমি মৃত সন্তান জন্ম দিয়েছি।চোখ থেকে অনবরত পানি পরছে।আজকে এতটা কষ্ট লাগছে বলে বোঝাতে পারবো না।আমার এই বাচ্চাটও আমাকে ধোকা দিয়েছে।ও আমার সাথে থাকলো না চলে গেলো আজীবন এর জন্য। আমি দোষটা কি করেছি সেটাই বুঝলাম না।এর জন্য আমি আমার দুটো সন্তানের সাথে বিচ্ছিন্ন হয়েছি আর এই বাচ্চাটাও আমাকে বোকা বানিয়ে পাখির মতে উরে গেলো।

কেন যেন আমার নিশ্বাস আজকে খুব ভারি লাগছে মনে হচ্ছে আর বাচবো না,তাই উনাকে আমাদের সন্তানদের অনেক রিকোয়েস্ট করে ডাকলাম।ওরা আসতে না চাইলেও অনেক জোর করার পর এলো।

আমার রুমে সবাই দাঁড়িয়ে আছে এক এক করে।আমি সবাইর দিকে তাকিয়ে আছি মন ভরে সবাইকে দেখছি কিছু সময় নাতি নাতনিদের একটু আদর করলাম। বসে থাকতে পারছি না শুয়ে শুয়েই আদর করছি।

এরপর আমার ছেলে আর মেয়েকে আমার পাশে বসতে বললাম ওরা আমার পাশে বসতেই আমার হাত দিয়ে ওদের হাত দুটোকে ধরে রাখলাম আর বলতে লাগলাম,

-----কেমন আছিস তোরা?

দুইজনেই ----ভালো।

-----হুম।আচ্ছা আমার একটা কথা রাখবি।

দুইজনেই-----কি?

-----আমার বাসায় আবার জাবি এখোন থেকে।আরতো কোন সমস্যা নেই।তোদের বোন হয়েছিলো সেওতো এখোন আর বেচে নেই তাহলে তোদেরতো এখোন আর লোকেও কিছু বলবে না।তাই তোরা এখোন গিয়ে থাকতেই পারিস।

ওরা আমার সামনে চোখের পানি ছেরে দিয়ে বললো,

-----আমাদের মাফ করে দাও আমরা বুঝতে পারিনি এমন কিছু হবে।বাবা রক্তের কথা বলেছে। কিন্তু আমরা ভেবেছি রক্তের জোগার হয়েগেছে এটা এক্সট্রা রক্তের কথা বলে রেখেছিলো আমাদের এখানে নিয়ে আসার জন্য ।আমাদের মাফ করে দাও মা

-----ধুর বোকা মাফ কেন চাচ্ছিস।তোরা তো আমারি সন্তান তোদের উপর আমি রাগ করে থাকতে পারি।তোদের উপর আমার কোন অভিজোগ নেই বাবা।দোয়া করি তোরা সবাই সুখে থাক।তোদের খুশিতেই আমি খুশি।তোর বাবার খেয়াল রাখিস। আমার সময় শেষ। আমি আর নিশ্বাস নিতে পারছি না খুব কষ্ট হচ্ছে।

-----কিছু হবে না মা তোমার। আমরা আছিতো।

----হ হে ব বাবা ত ত তোরা তো আছিস আমার আর কি হবে।

----কিছু হবে না আমরা ভালো ডাক্তার দেখাবো তোমাকে।

শুধু ধু এতটুকুই শুনতে পেলাম আর কিছু না। নিশ্বাসটা যেন সেকেন্ড সময়ে বন্ধ হয়ে গেলো,, চিরতরে চলে গেলাম ওদের ছেরে অনেক দুর।

সমাপ্ত।

 

Eliyana Aara

সময় থাকতে সবাইকে বুঝেন।শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে চলে গেলে আর পাবেন না শেই মানুষটাকে।বেচে থাকতেই সবাইকে মুল্য দেওয়া উচিত।

Tags:

About author
আমি গল্প এবং বই প্রেমিক একজন মানুষ। গল্প এবং বই পড়তে খুবই ভালোবাসি। যেখানেই যে গল্প অথবা কাহিনী খুজে পাই সেগুলো সংগ্রহ করি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি। আমি নিজেও কয়েকটি গল্প লিখেছি তবে সেগুলোর সংখ্যাটা খুবই সামান্য।