সার্থকতার প্রাপ্তি

  • Share this:

আমি তখন সবে প্রাইমারী শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। আমার পোস্টিং হয় বরগুনা জেলার পরীরখাল নামক একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ছোটবেলা থেকেই আমি ঢাকা শহরে থাকার দরুন এই প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের এতোটা কাছাকাছি আসার সুযোগ আমার এই প্রথমবারই ছিলো। শহরের ইট পাথরের দালানকোঠা পেড়িয়ে আমি যে গ্রামের এই মনোরম আবহকুল অনুভব করতে পারবো তা স্বপ্নেও ভাবিনি।

যখন প্রথমদিন আমি স্কুলের গন্ডি পেড়িয়ে সামনে এগোই তখনি দেখতে পাই স্কুলের ছোট্ট ছোট্ট ছেলেমেয়েগুলো আমাকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য একই সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে আমার আসার অপেক্ষার প্রহর গুনছে। স্কুলের শিক্ষকরাও ছিলো খুবই অমায়িক। একজন শিক্ষকের উপর সম্মানিত ব্যক্তি যে আর কেউ নেই সেটা আমি সেদিনই প্রথম বুঝতে পারি। গ্রামের ছেলেমেয়েগুলোর শরীরের ড্রেস নামক আস্তরণ গুলো শহুরে ছেলেমেয়েদের মতো এতো চাকচিক্যপূর্ণ না হলেও তাঁদের শিক্ষকের প্রতি সম্মান প্রদর্শনটুকু ছিলো অসীমেরও উর্ধ্বে।

এভাবেই বেশ কিছুদিন ছোট ছেলেমেয়েগুলোর ক্লাস নেওয়ার অন্তর একদিন আমি তৃতীয় শ্রেণীর ইংরেজী ক্লাস নিতে আসি। তৃতীয় শ্রেণীর ক্লাসে আসার পর থেকে আমি প্রতিবারই ক্লাসের শেষ বেঞ্চে একটি ছেলেকে চুপচাপ এবং মুখ ভারী করে বসে থাকতে দেখতাম। সেদিনও তার ব্যতিক্রম ছিলোনা তাই অনেকটা কৌতুহলবসত আমি ছেলেটির সামনে আসতেই সে কিছুটা হকচকিয়ে উঠলো। আমি ওকে কিছু ইংরেজী শব্দার্থ জিজ্ঞেস করতেই ও ফড়ফড় করে আমাকে সব বলে দিলো। আমি কিছুটা অবাক হলাম বটে কেননা সামনের বেঞ্চে বসা ছেলেমেয়েগুলোও ওর মতো এতোটা নিখুঁতভাবে সবগুলো শব্দের অর্থ বলতে পারেনি। আমি ছেলেটির গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে নরম স্বরে বললাম,

-তুমি এতো ভালো ছাত্র হওয়ার পরও কেন পিছনে বসো? কাল থেকে কিন্তু আমি তোমাকে প্রতিদিন সামনের বেঞ্চে দেখতে চাই।

ছেলেটি আমার কথায় সায় দিলো ঠিকই তবে ওর মুখে আমি তেমন উৎফুল্ল আভা দেখতে পেলাম না।

এরপর প্রতিদিনই ছেলেটি আমার ক্লাসে প্রথম বেঞ্চে নিজের আসনটি স্থায়িত্ব করে নিয়েছিলো। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো আমি ব্লাকবোর্ডে কিছু লিখলেও ছেলেটি ওর খাতায় তা কখনোই লিখতো না। বেশকিছুদিন বিষয়টি খেয়াল করতে পেরে একদিন আমি অনেকটা রাগান্বিত স্বরেই ওকে জিজ্ঞেস করলাম,

-এই সবাই লিখছে আর তুমি লিখছো না কেন? অনেক মেধাবী হয়ে গেছো নাকি?

ছেলেটি আমার কথায় কিছুটা লজ্জা পেয়ে বললো,

-স্যার! আসলে আমার খাতাটা শেষ হয়ে গেছে।

পাশ থেকে আরেকটি ছেলে বলে উঠলো,

-স্যার! ও প্রত্যেকদিনই এই শেষ হওয়া খাতা নিয়া স্কুলে আসে।

পাশের ছেলেটির কথায় পুরো ক্লাস জুড়ে সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পরলো। সকলকে ধমক দিয়ে চুপ করানোর অন্তর আমি ছেলেটির দিকে তাকাতেই দেখতে পাই সে নতমস্তিষ্কে বেঞ্চের দিকে একনয়নে তাকিয়ে রয়েছে। ওর মনের অবস্থা আমি বুঝতে পেরে শান্ত স্বরে বলে উঠলাম,

-যাই হোক কাল থেকে তুমি নতুন খাতা নিয়ে স্কুলে আসবে। এরপর যদি দেখেছি যে আমি লেখা সত্ত্বেও তুমি কিছু লিখছোনা তবে কিন্তু তোমার শাস্তি হবে। বুঝেছো?

ছেলেটি সায় দিয়ে হ্যাঁবোধক ইঙ্গিত দিলো অতঃপর আমি পুনরায় পড়ানোর দিকে মনোযোগ দিলাম।

পরদিন তৃতীয় শ্রেণীতে প্রবেশ করার পর সামনের বেঞ্চে দৃষ্টি দিতেই দেখি ছেলেটি আজ আসেনি। পুরো ক্লাস জুড়ে নিজের অক্ষিগোলকের দৃষ্টিরেখা বিচরণ করার পরও ছেলেটিকে খুঁজে পেলাম না। মনে মনে ভাবছি হয়তো বাড়িতে কোনো সমস্যা থাকার কারণেই সে আজ স্কুলে আসেনি। এভাবে এক এক করে তিনদিন চলে যাওয়ার পরও যখন স্কুলে ছেলেটির দেখা পেলাম না তখন তৃতীয় শ্রেণীর সকল ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলাম,

-এই তোমরা কি জানো সায়েমের কি হয়েছে? ও স্কুলে আসছে না কেন?

কিন্তু সকলের নীরবতাই আমাকে জানান দিলো যে ওরা সায়েমের সম্পর্কে কিছুই জানেনা না। তৎক্ষনাৎ আবার বললাম,

-কেউ কি সায়েমের বাসা চিনো?

পিছন থেকে একটি ছেলে হাত উঁচু করে বললো,

-জ্বী স্যার! সায়েমের বাড়ি আমার পাশেই।

সেই ছেলেটিকে নিয়ে সায়েমের বাড়িতে উপস্থিত হতেই দেখতে পাই একটি জরাজীর্ণ ছোট্ট ঘরের দরজায় বসে এক মধ্যবয়স্ক মহিলা খুব যত্নসহকারে কাঁথা বুনছে। মহিলাটি আমাকে দেখেই মাথার ঘোমটা টুকু আরো কিছুটা গভীর করলো। পরক্ষণেই আমার সাথে থাকা ছেলেটি মহিলাটিকে উদ্দেশ্য করে বললো,

-খালাম্মা! আমাগো স্কুলের স্যার উনি। সায়েম স্কুলে যায় না দেইখা উনি খোঁজ নিতে আইছে।

আমি সায়েমের শিক্ষক শুনে মহিলাটি অনেকটা তাড়াহুড়ার সহিত আমার জন্য একটি বসার ফিড়ি এগিয়ে দিলেন। তাঁর আতিথেয়তায় আমি মুগ্ধ হলাম বটে তবে পরক্ষণেই বললাম,

-জ্বী আমি বসার জন্য আসিনি। সায়েম স্কুলে যাচ্ছে না কেন?

মহিলাটি কিছুটা ইতঃস্তত ভঙ্গিতে বললেন,

-স্যার! কি আর কমু কষ্টের কথা! পোলাডার অনেক পড়ালেখার সখ কিন্তু ওরে একটা খাতা কিন্না দেওয়ার সামর্থ্যও আমার নাই। ওর জন্মের এক বছরের মাথাতেই ওর বাপে নদীতে মাছ ধরতে যাইয়া আর ফিরা আসেনাই। কোন স্যারে নাকি ওরে নতুন খাতা নিয়া স্কুলে যাইতে বলছিলো কিন্তু আমার কাছে কোনো টাকা না থাকায় ওরে কিন্না দিতে পারিনাই। তাই ও খালের মইধ্যে মাছ ধরতে গেছে। ও নাকি ঐ মাছ বেইচ্চা খাতা কিনবো। আপনেই বলেনতো স্যার এই গরমের সময় মাছ আইবো কই থিকা? বর্ষা কাল হইলেও একটা কথা আছিলো। কিন্তু ছ্যামড়ায়তো আমার কথা একটাও শুনলোনা। পাশের বাড়ির ভাবি আমারে এই কাঁথাটা সেলাই করতে দিছে। চিন্তা করছি এই কাঁথা দিয়া যেই টাকা পামু সেইডা দিয়াই ওরে খাতা কিন্না দিমু, স্যার। তারপর দেখমুনে ও স্কুলে না যাইয়া কেমনে পারে?

মহিলার কথা শুনে আমার হাতগুলো কেন যেন খুব করে কাঁপছিলো। মানুষ কতটা অভাবে থাকতে পারে সেটা বোধহয় আজ সায়েমের বাড়িতে না আসলে আমি কোনোদিনই দেখতে পেতাম না। সামান্য একটি স্কুলের খাতা কিনে দেবার সামর্থ্যও তাঁর নেই, কতটা অসহায় তাঁরা। পরক্ষণেই সায়েম কোত্থেকে যেন দৌড়ে এসে অনেকটা উৎফুল্ল ভঙ্গিতে বললো,

-মা এই দেখো কত বড় একটা কাতলা মাছ পাইছি। এইটা বেইচ্চা খাতা কিনমু আমি।

পরমুহূর্তেই সে আমাকে তাঁর বাড়িতে উপস্থিত হতে দেখে ক্ষনিকের মধ্যেই তাঁর উৎফুল্ল মুখখানা চুপসে গেলো।

সেদিন আমি সায়েমের মাছখানা এক দুই টাকা নয় বরং পাঁচশত টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছিলাম। জানি মাছটির দাম গ্রামের ভিত্তিতে একশত টাকাও হবেনা তবে ছেলেটির মুখে একটুখানি হাসি ফুটানোর জন্যই এমনটা করেছিলাম। সে তখন স্বভাবতই হতবিহ্বল দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো।

এরপর থেকে সায়েমের প্রতি আমার আলাদা একটা মায়া ও দায়িত্ববোধ কাজ করতো। সেটা ছেলেটির মেধার কারণে নাকি ওর অসহায়ত্বের কারণে তা আমার জানা ছিলোনা।

এভাবেই কেঁটে যায় দুটো বছর...

সায়েমের পড়ালেখার ক্ষেত্রে যাবতীয় যত কিছু লাগতো সেটা আমি নিজেই দেওয়ার চেষ্টা করতাম। যেদিন পঞ্চম শ্রেণীর বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সেই স্কুলের একমাত্র ছাত্র হিসেবে সায়েম ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায় সেদিন সে ভরা স্কুলের সামনেই আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলো। স্কুলের সকল শিক্ষক ছাত্ররাও সেদিন এই আনন্দে হাততালি দিতে ভুল করেনি। আমি তখন দূর থেকে সায়েমের মায়ের আঁচল দিয়ে অশ্রু মোছার দৃশ্য খুব স্পষ্টতই দেখতে পাচ্ছিলাম। এই জীবনে আমার যতগুলো সার্থকতার চিহ্ন আমি বয়ে বেড়িয়েছি তাঁর মধ্যে সর্বাপেক্ষা বড় সার্থকতা ছিলো সায়েমের এই সফলতার পেছনে আমার করা বিন্দুমাত্র সাহায্যটুকুই।

এর কিছুমাস পর আমি জরুরী প্রয়োজনে ঢাকাতে ট্রান্সফার হই। কিন্তু পরবর্তীতে সায়েমের সাথে দেখা করার তুমুল আগ্রহ মনে উঁকি দিলেও তা আর সম্ভব হয়নি কখনোই। একটি দুটি করে প্রায় ত্রিশটি বছর কেঁটে যায়, ইতোমধ্যে আমি রিটায়ার্ডও নিয়েছি। এমনকি বহু ব্যস্ততা এবং বিভিন্ন বিষয়ের কারণে সায়েমের কথাও আমার মন থেকে পুরোপুরিভাবেই মুছে গিয়েছিলো।

ইদানিং বার্ধক্যজনিত সমস্যার কারণে আমার শরীরে বেশ কিছু মারাত্মক রোগ বাসা বেঁধেছে। রিটায়ার্ড হয়ে যত টাকা পেয়েছিলাম তা নিজের জন্য রেখে না দিয়ে আমার ছেলেমেয়েদেরকে ভাগ করে দিয়েছিলাম এই ভেবে যে তাঁরা যদি আমার একটুখানি খেয়াল রাখে। কিন্তু হলো তাঁর উল্টো, ছেলেমেয়েগুলো টাকা নিয়ে যে যার মতো চলে গেলো। এই নিয়ে আমার স্ত্রী মাঝেমধ্যেই ওদেরকে বদদোয়া দেয় কিন্তু আমি বারংবারই বলি,

-ছেলেমেয়েদের নিয়ে কখনো খারাপ কিছু কামনা করতে নেই। তাঁরা যদি ভালো থাকে তবে থাকুক না যার যার মতো।

এদিকে আমার শরীরের অবস্থা দিনকে দিন অবনতির পর্যায়ে চলে যাওয়াতে আমার স্ত্রী জোরপূর্বকই আমাকে হসপিটালে নিয়ে গেলো। যদিও আমি টাকা খরচের ভয়ে একদমই যেতে রাজি ছিলাম না। বিভিন্ন টেষ্ট দেওয়ার পর জানা গেলো আমার পিত্তে পাথর হয়েছে এবং কিডনীর কার্যক্ষমতাও প্রায় শেষ বললেই চলে। ডাক্তারের কাছে জিজ্ঞেস করার পর তিনি জানান সবমিলিয়ে আমার তিনলক্ষ টাকা খরচ হবে। আমার স্ত্রীর নিকট একটি পুরোনো আমলের স্বর্ণের দুল ছিলো কিন্তু সেটা বিক্রি করলেও কোনোভাবেই এক লক্ষ টাকার বেশি হবার কথা নয়। আমার স্ত্রী তখন সেই ডাক্তারের নিকট অনেকটা আকুতি স্বরেই বললো,

-আচ্ছা কোনোভাবে কি টাকার অঙ্কটা একটু কমানো যায়নাহ?

-আমি কিছু করতে পারবোনা। আপনি বরং এই হসপিটালের হেড ডাক্তার ড. সায়েম শাহরিয়ারের সাথে কথা বলুন।

সায়েম নামটি শুনেই আমার কিছু একটা মনে আসতে যেয়েও যেন আসলোনা।

অতঃপর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আমরা ড. সায়েমের সাথে দেখা করার সুযোগ পেলাম। ওনার চেম্বারে প্রবেশ করতেই দেখি তিনি একমনে কোনো ফাইল ঘাটাঘাটি করছেন। পরক্ষণেই আমাদের দিকে না তাকিয়েই তিনি বললেন,

-বসুন আপনারা। বলুন কিভাবে সাহায্য করতে পারি?

আমার স্ত্রী বেশ ইতোস্তত ভঙ্গিতে বললো,

-আসলে আমার স্বামীর দুটো অপারেশনের জন্য তিন লক্ষ টাকা চাচ্ছে। কিন্তু আমাদের এতো টাকা দেওয়ার সামর্থ্য নেই। যদি একটু কমাতেন এই আরকি।

ড. সায়েম এই কথা শুনে আমার স্ত্রীর দিকে তাকিয়েই ফের আমার দিকে তাকালেন। তিনি বেশ কিছুক্ষণ যাবৎ আমার দিকে অবাক নয়নে তাকিয়েই আছেন আর আমিও। ওনাকে দেখে আমার বেশ চেনা চেনা লাগলেও আমি কোনোভাবেই তাঁর আসল পরিচয় আঁচ করতে পারছিলামনা। হঠাৎ সে দাঁড়িয়েই বললো,

-স্যার! আপনি কি পরীরখালা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন?

আমি ওনার কথায় বেশ অবাক হয়ে উত্তর দিলাম,

-হ্যাঁ ছিলামতো একসময়।

পরক্ষণেই সে নিজের চেয়ার থেকে উঠে আমার সামনে এসে পা ধরে সালাম করেই আমাকে জড়িয়ে ধরলো।

আমার আর একমুহূর্ত বুঝতে বাকি রইলোনা এ আর কেউ নয় বরং আমারই সেই প্রিয় ছাত্র সায়েম। যে আমাকে এভাবেই জড়িয়ে ধরেছিলো সেই ছোট্ট ছাত্র অবস্থায় যখন সে একমাত্র ছাত্র হিসেবে বৃত্তি পেয়েছিলো।

কিছু কিছু সার্থকতার প্রাপ্তি এবং সম্মান মনে হয় যুগ যুগ পেড়িয়ে গেলেও এর তীক্ষ্মতা একটুও কমে না বরং বেড়েই চলে। আর এটা তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিলো বোধহয়।

.

(সমাপ্ত)

.

Misk Al Maruf

{সত্য ঘটনা অবলম্বনে}

Tags:

About author
আমি গল্প এবং বই প্রেমিক একজন মানুষ। গল্প এবং বই পড়তে খুবই ভালোবাসি। যেখানেই যে গল্প অথবা কাহিনী খুজে পাই সেগুলো সংগ্রহ করি এবং আপনাদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি। আমি নিজেও কয়েকটি গল্প লিখেছি তবে সেগুলোর সংখ্যাটা খুবই সামান্য।